শুক্রবার | ১৭ এপ্রিল, ২০২৬ | ৪ বৈশাখ, ১৪৩৩ | ২৮ শাওয়াল, ১৪৪৭

সিএনএনের বিশ্লেষণ

এত শক্তিধর হয়েও ইরান যুদ্ধে কেন জয় পাচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র

ডেস্ক রিপোর্ট

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের ওপর হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা জবাব দিতে শুরু করে ইরানও। দেশটি ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনায় ভয়াবহ হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে গোটা মধ্যপ্রাচ্য অগ্নিগর্ভে পরিণত হয়েছে। এছাড়া বিশ্ব জালানি পরিহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এতে বিশ্বের জ্বালানি তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধে সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থেকেও কেন দ্রুত জয় পাচ্ছে না আমেরিকা- এই প্রশ্ন এখন গোটা বিশ্বে আলোচনার কেন্দ্রে। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরানের কৌশলগত পাল্টা চাল, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তার প্রভাব এবং রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ মিলিয়ে এই যুদ্ধ ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। ফলে শক্তির লড়াই নয়, এখন মূল প্রতিযোগিতা কে কতটা চাপ সৃষ্টি করতে পারে সেই ‘প্রভাব বিস্তারের’ খেলায়।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এই যুদ্ধ নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে ইউক্রেনের হাতে কোনও ‘কার্ড’ নেই বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায়ই বলে থাকেন। কিন্তু ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে এখন আমেরিকার নিজের অবস্থান নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। সামগ্রিকভাবে দেখলে, জনসংখ্যা, সামরিক শক্তি ও অর্থনীতির দিক থেকে ইরানের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র অনেক এগিয়ে। এর সঙ্গে ইসরায়েলের শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক যুক্ত হলে তেহরানের সঙ্গে এই লড়াইটি অসম বলেই মনে হয়।

তবে বাস্তবে ইরান তাদের সীমিত শক্তিকেই কৌশলগতভাবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভীষণ চাপ সৃষ্টি করছে। নিজেদের জনগণকে বড় ধরনের ক্ষতি সহ্য করতে বাধ্য করেও তারা টিকে আছে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, ইরান বরং কৌশলগত উদ্যোগ নিজেদের হাতে নিতে পেরেছে।

যুদ্ধের এক মাস পর এটি এখন শক্তির লড়াই নয়, বরং ‘লিভারেজ’ বা প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। ট্রাম্পের হাতে বেশি শক্তি থাকলেও নিশ্চিত জয় পেতে হলে তাকে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি মেনে নিতে হতে পারে, আর এটি তিনি এড়িয়ে চলতে চান।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সরাসরি হারাতে না পারলেও ইরান একটি বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। আর তা হচ্ছে- হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া। এটি বিশ্ব জ্বালানি রফতানির একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতি চাপে পড়ে গেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও রাজনৈতিক চাপ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

ট্রাম্পের কূটনৈতিক সাফল্য কি সীমিত?
সিএনএন বলছে, হোয়াইট হাউসের এক ব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ওই ব্রিফিংয়ে প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানান, ইরান কয়েক দিনের মধ্যে অতিরিক্ত ২০টি তেলবাহী জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে, এটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কূটনৈতিক সাফল্য।

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার তথ্যানুযায়ী, যুদ্ধের আগে প্রতিদিন ১০০টির বেশি জাহাজ গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ ব্যবহার করতো। সে তুলনায় ২০টি জাহাজ খুবই সামান্য। অর্থাৎ, এই ‘সাফল্য’ আসলে যুদ্ধের কারণে তৈরি সমস্যার সামান্য অংশ কমানো ছাড়া কিছু নয়।

বাস্তবতা হলো- যুক্তরাষ্ট্র চাইলে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে পারে। কিন্তু যদি মার্কিন নৌবাহিনী সেখানে যায় এবং ইরান হামলা চালায় বা কোনও জাহাজ ডুবিয়ে দেয়, তাহলে তা ইরানের জন্য বড় বিজয় হবে।

এছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে স্থল অভিযানে গেলে মার্কিন সেনাদের হতাহতের ঝুঁকি থাকবে। আর এটিও ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও দুর্বল করতে পারে।

খার্গ দ্বীপ ও সম্ভাব্য ঝুঁকি
উত্তর পারস্য উপসাগরে ইরানের তেল রফতানির কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখলের বিষয়টিও যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনায় রয়েছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি ইরানের তেল নিয়ন্ত্রণে নিতে চান। এতে ইরানের অর্থনীতি দুর্বল হতে পারে, তবে এতে ইরান আত্মসমর্পণ করবে এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং তারা আরও আক্রমণাত্মক হতে পারে এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ছাড়ার আগ্রহ কমে যেতে পারে।

পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক অগ্রগতি হচ্ছে বলে ট্রাম্প দাবি করলেও ইরান তা অস্বীকার করছে। একই সঙ্গে ট্রাম্প তেহরানকে আলোচনায় আনতে নজিরবিহীন হামলার হুমকিও দিচ্ছেন। এ অঞ্চলে হাজার হাজার মার্কিন মেরিন সেনা এবং আকাশপথে মোতায়েনযোগ্য হাজারেরও বেশি সেনা পাঠানো হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইউরেশিয়া গ্রুপের সভাপতি ও প্রতিষ্ঠাতা ইয়ান ব্রেমার বলেন, এটি উত্তেজনা কমানোর পথ নয়, বরং পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার ইঙ্গিত।

এর আগে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, চুক্তি না হলে তিনি ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র, তেলক্ষেত্র ও খার্গ দ্বীপ ধ্বংস করে দিতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্র এমন হামলা চালাতে সক্ষম হলেও, পাল্টা হামলা হলে উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর ওপর বড় প্রভাব পড়বে। বৈশ্বিক বাজার অস্থির হয়ে উঠবে, মন্দার ঝুঁকি বাড়বে। এমনকি মরুভূমি অঞ্চলে পানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ লবণমুক্তকরণ প্ল্যান্টে হামলা চালানো হলে তা যুদ্ধাপরাধের প্রশ্নও সামনে আনতে পারে।

নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আরেকটি বড় ‘কার্ড’ রয়েছে। আর তা হচ্ছে— ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা। তেলের রফতানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইরানের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটিতে সাম্প্রতিক বিক্ষোভও এর কারণেই শুরু হয়েছিল। যদিও সেই বিক্ষোভ নিরাপত্তা বাহিনী কঠোরভাবে দমন করে।

তবে ইরানের তেল রফতানি বন্ধ করার চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বব্যাপী তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসন একপর্যায়ে ইরানি জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতেও বাধ্য হয়।

এছাড়া হোয়াইট হাউসের ১৫ দফা শান্তি প্রস্তাবেও এমন অনেক শর্ত রয়েছে, যা তেহরান সহজে মেনে নেবে না। যেমন ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ বা হরমুজ প্রণালির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়া।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন ইরানের ওপর হামলার সংখ্যা প্রকাশ করছে। এটি ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ের হতাহতের হিসাবের সঙ্গে তুলনার ঝুঁকি তৈরি করছে। কারণ সেটি পুরো যুদ্ধের বাস্তব চিত্র আড়াল করেছিল।

লেভিট বলেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা ধ্বংসের চাপ থেকে বাঁচতে আলোচনায় আসতে আগ্রহী হচ্ছে। তবে এই মূল্যায়ন বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না।

ইরানের কৌশলগত সুবিধা
সামরিকভাবে পিছিয়ে থাকলেও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে ইরান বড় কৌশলগত সুবিধা পেয়েছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে আফ্রিকা ও এশিয়ার জ্বালানি ও অর্থনীতিতে পড়েছে। যদি আরও কয়েক সপ্তাহ এই পরিস্থিতি চলতে থাকে, তাহলে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে এবং ট্রাম্পের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপও বাড়বে।

এছাড়া যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর ওপরও বড় প্রভাব পড়ছে। কারণ পর্যটন ও বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে চায় এসব দেশ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বেশিরভাগ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে বলে দাবি করলেও, ইরান অল্প কিছু হামলা চালিয়েই বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি করতে সক্ষম হচ্ছে।

আর তাই যুদ্ধ আরও যত দীর্ঘ হবে, ট্রাম্পের ওপর চাপও তত বাড়বে এবং তাকে এমন একটি চুক্তি করতে হতে পারে, যা তাকে শক্তিশালী নয়, বরং দুর্বল অবস্থানেই নিয়ে যাবে।

সময় ফুরিয়ে আসছে
দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে ইরানের জন্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার জরুরি। অন্যদিকে ট্রাম্পের ধৈর্যও সীমিত। দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান না হলে তিনি এমন পদক্ষেপ নিতে পারেন, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলবে।

কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের কর্মকর্তা ত্রিতা পারসি বলেন, একবার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে ট্রাম্পের পক্ষে পিছু হটা কঠিন হয়ে যাবে। তার মতে, ইরানের হাতে সময় কিছুটা বেশি থাকলেও তা সীমাহীন নয়।

মূলত যুদ্ধে ‘লিভারেজ’ বা প্রভাব বিস্তারের খেলা তখনই মূল্যবান, যখন তা কৌশলগত বিজয় এনে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান- দুই পক্ষেরই কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রয়েছে। তবে যদি কেউই অপর পক্ষকে সমাধানের পথ না দেখায়, তাহলে এই সংঘাত শুধু দুই দেশ নয়, পুরো বিশ্বকে বড় বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

সূত্র: সিএনএন

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ

  • Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
     12345
    6789101112
    13141516171819
    20212223242526
    27282930