শুক্রবার | ১৭ এপ্রিল, ২০২৬ | ৪ বৈশাখ, ১৪৩৩ | ২৮ শাওয়াল, ১৪৪৭

সিজিএস’র সংলাপে রাশেদা কে চৌধুরী

সরকারের কিছু কিছু সিদ্ধান্ত মানুষের কাজে আসবে না

ডেস্ক রিপোর্ট

সিজিএস-এর ‘শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য’ বিষয়ক সংলাপে রাশেদা কে চৌধুরী

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেছেন, আমাদের এই সরকারের কাছে অনেক প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু মনে হচ্ছে শিক্ষাটা অগ্রাধিকার থেকে ছুটে গেছে। কোথায় গেছে বলতে পারি না, আপনারাও জানেন। কিছু কিছু সিদ্ধান্ত, কিছু কিছু কাজ তারা করেছেন, যা সাধারণ মানুষের কোনো কাজে আসবে না।

সোমবার (২৫ আগস্ট) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য’ বিষয়ক সংলাপে অংশ নি‌য়ে এসব কথা ব‌লেন তি‌নি।

রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, আমরা শুধু পুনর্গঠন চাইছি না, আমরা রূপান্তর চাইছি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে। রূপান্তর শুধু বই ছাপালেই বা শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করলেই আসবে না। শিক্ষার্থীদের নীতিবান মানুষ তৈরি করতে হবে। শিক্ষার্থীকে পরীক্ষার্থী বানিয়ে নয়, শিক্ষার্থীকে মানুষ করতে হবে।

অনুষ্ঠানে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, আইইডিসিআর-এর উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন, জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, গণফোরাম-এর সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান, জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. তাসনিম জারা, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ড. মামুন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস-এর সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদ, বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম, জি-নাইনের সাধারণ সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্থ, সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী গোলাম সারোয়ার মিলন, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. শওকত আরা হোসাইন, জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ড. সরদার এ. নাঈম, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট ড. ডি কে শিল অর্পণ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ-এর সভাপতি জিল্লুর রহমান।

জিল্লুর রহমান বলেন, বর্তমানে দেশে সংস্কার একটি বহুল আলোচিত বিষয়। কিন্তু শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত নিয়ে তেমন একটি আলোচনা হয়নি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের মৌলিক চাহিদাগুলোর দিকে তেমন একটা মনোযোগও দেওয়া হয়নি। দেশে বিভিন্ন সংস্কার কমিশন তৈরি করা হলেও শিক্ষাবিষয়ক সংস্কার কমিশন তৈরি হয়নি। দেশে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করে কীভাবে অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা যায় এ বিষয়ে কাজ করতে হবে।

জাহিদ হোসেন বলেন, গত ১৩ মাস ধরে শিক্ষা নিয়ে দেশে কেউ কথা বলে না। পরীক্ষা নিয়েও কিছু একটা বলে না। কোভিডের সময় দেখলাম অটোপাস দেওয়া হয়েছে। এসব আমাদের শিক্ষার মানকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আল্লাহ জানে। কয়েক বছর আগে দেখলাম নিরীক্ষকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে নাম্বার বাড়িয়ে দেওয়ার জন্যে। এসব আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক হুমকি।

তি‌নি বলেন, আমাদের আজকের যে অধঃপতন, এর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী নীতিনির্ধারকরা আর আমাদের যারা জড়িত ছিল। এদেশের বড় সমস্যা শিক্ষিত মানুষ। অশিক্ষিত গরিব মানুষ এদেশের সমস্যা না। ওরা কেউ এই চেয়ারে বসে না, আমরা যারা এই চেয়ারে বসি তারা দায়ী।

জাহিদ হোসেন বলেন, বিশেষায়িত স্বাস্থ্য সেবার আমাদের যে স্তরগুলো আছে, এগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে। এদেশে সরকারি খাতের পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বেসরকারি খাত বিগত ৩০-৪০ বছরে বেশ উন্নতি করেছে। সেটাকে কীভাবে আরো মানসম্মত করা যায় তা নিয়ে কাজ করতে হবে।

অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, বর্তমানে আমাদের দেশে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার হ-য-ব-র-ল অবস্থা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য কমিশন করুন এবং কুদরত-ই খুদা শিক্ষা কমিশন বাস্তবায়ন করুন। সবার একটি দাবি হলো শিক্ষা কমিশন চাই, যেটি এই সরকারে নেই।

ড. মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন বলেন, বর্তমান সরকার একটি স্বাধীন স্বাস্থ্য কমিশনের কথা প্রস্তাব করেছে। স্বাধীন স্বাস্থ্য কমিশনটি হলে, স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনাগুলো তাদের নিজস্ব উদ্যোগে বাস্তবায়ন করতে পারে।

তিনি আরো বলেন, দেশের প্রধান হাসপাতালগুলোতে রোগীদের পা ফেলার জায়গা নেই। কিন্তু সেকেন্ডারি কেয়ার হাসপাতাল, যেগুলো উপজেলা হাসপাতাল খালি পড়ে থাকে।

তি‌নি বলেন, সব স্তরের হাসপাতালগুলো সমানভাবে ইউটিলাইজ করার ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য উপজেলা লেভেলের হাসপাতালগুলোর স্বাস্থ্য সেবার মানের দিকে আরো বেশি নজর দিতে হবে। এভাবে স্বাস্থ্য সেবার বিকেন্দ্রীকরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, গ্রামে মেডিকেল কলেজ হয়ে যাচ্ছে কিন্তু অবকাঠামো নেই। কোটি টাকার মেডিকেল সরঞ্জাম অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে অথচ অনেক জায়গায় অপারেশনের সরঞ্জামের অভাবে চিকিৎসা হচ্ছে না। আমাদেরকে এসব জায়গার দিকে নজর দিতে হবে।

ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে গত কয়েকটি সিন্ডিকেট ইলেকশনে একজন শিক্ষককেও খুঁজে পাওয়া যায়নি যিনি অন্য রাজনৈতিক প্লাটফর্মকে প্রতিনিধিত্ব করবেন। তাহলে কি সব মেধাবী এক জায়গায় ছিল? অথবা আমরা এমন শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছি যারা এতটাই ভীতু নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করার সাহস রাখে না। এমন একটা সমাজে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনার-ই বা কী আছে?

ডা. তাসনিম জারা বলেন, দেশে মেডিকেল ইমার্জেন্সি হলে কোথায় গেলে সেবা পাবেন সেটা পরিষ্কার না। এছাড়াও পর্যাপ্ত পরিমাণে সেন্টার নেই। আমরা বলছি যে সারাদেশে যেন ইমার্জেন্সি সেবা নিশ্চিত করা যায়। বাসা থেকেই যেন অ্যাম্বুলেন্স নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে আমাদের এই সিস্টেমটাই নেই।

তিনি আরো বলেন, আমরা একটা হেলথ রেকর্ডের কথা বলছি যেখানে জন্ম থেকে সব রেকর্ড নথিভুক্ত করা থাকবে। যেন এক হাসপাতালের পর অন্য কোথাও গেলে পুরোনো রেকর্ড হারিয়ে না যায় বা পুনরায় টেস্ট করা না লাগে। এতে করে খরচ অনেকাংশে কমে যাবে।

এ ছাড়া, বায়োব্যাংক ও কস্ট-কাটিংকে প্রায়োরিটি দেওয়া জরুরি। আমাদের দেশে জনগণের কোন চিকিৎসাটা কাজ করবে, কোন ব্যবস্থাটা কাজ করবে এটি বোঝার জন্য গবেষণা প্রয়োজন, যা বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হচ্ছে। তিনি বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থাকে কীভাবে ডিজিটাল করা যায় ও এদেশের জনগণের জনশক্তিতে রূপান্তরিত করা যায় এই ব্যাপারে আমাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

জোনায়েদ সাকি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একটি মানসম্মত জায়গায় নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বরকন্দাজি প্রশাসন চর্চা আমরা দেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে শাসকের যে বরকন্দাজি এবং শিক্ষকরা এখানে ব্যবহৃত হন, এই জায়গা যদি পরিবর্তন না হয় এবং জাতীয় কনসেনশাস তৈরি না হয়, তবে সত্যিকার অর্থে পরিবর্তন হবে না।

ড. মামুন আহমেদ বলেন, গত ১৪-১৫ বছরে বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা যাদের হাতে ভেঙে পড়েছে তারা প্রত্যেকেই শিক্ষিত মানুষ। তাদের হাত ধরে বাংলাদেশের সব ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। তার মানে আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় কোথাও একটা গলদ আছে। এজন্য আমরা একজন মানুষকে সত্যিকারের দ্বায়িত্বশীল করতে পারছি না, দক্ষতা অবশ্যই তৈরি করছি কিন্তু নীতিনিষ্ঠ করতে পারছি না।

মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে ৮ জনের পিএইচডি আছে, ৬ জন প্রফেসর। আমি জানি না তারা কেন শিক্ষা কমিশন তৈরি করেনি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য দুটিকে বলা হলো হিউম্যান ক্যাপিটাল তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। দক্ষিণ এশিয়ার দিকে তাকালে বোঝা যায় আমাদের দেশে এই দুটি খাত সবচেয়ে অবহেলিত। এখানে গুরুত্ব না দিলে আমরা সামনে এগোতে পারব না।

 

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ

  • Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
     12345
    6789101112
    13141516171819
    20212223242526
    27282930