| | |

ইরানে হামলার পর কোথাও ক্ষোভের আগুন, কোথাও উদ্‌যাপন

সাভার ডেস্ক

পাকিস্তানে রোববারের (১ মার্চ) সহিংসতায় অন্তত ২৩ জনের নিহত হওয়ার খবর মিলেছে। বন্দরনগরী করাচিতে মার্কিন কনস্যুলেটে বহির্ভাগের দেয়াল টপকানো বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে নিরাপত্তা রক্ষীদের গুলিতে ১০ জন মারা গেছে, জাতিসংঘের একটি কার্যালয় জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনায় উত্তরের শহর স্কার্দুদে মারা পড়েছে ১১ জন, দুইজন ইসলামাবাদে।

ইরাকে রাজধানী বাগদাদের গ্রিন জোন কূটনৈতিক এলাকার বাইরে জড়ো হওয়া হাজারো ইরানপন্থি বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশকে কাঁদুনে গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ছুড়তে হয়েছে; এই গ্রিন জোনেই মার্কিন দূতাবাসের অবস্থান।

প্যারিসে আবার উল্টো চিত্র; সেখানে উৎফুল্ল হাজারো মানুষ ইরানের বিপ্লব-পূর্ববর্তী রাজতন্ত্রের পতাকা হাতে উৎসব করেছে, কেউ কেউ সেখানে লাল গোলাপ ও বোতল বোতল শ্যাম্পেইনও নিয়ে আসে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

ইরানের পর তাদের পূর্ব ও পশ্চিমের দুই প্রতিবেশী পাকিস্তান ও ইরাকেই সবচেয়ে বেশি শিয়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর বাস। এবং এ দুটি দেশেই ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ-বিক্ষোভ, অস্থিরতা দেখা গেছে।

করাচিতে মার্কিন কনস্যুলেটের ভেতরেই বিক্ষোভকারীরা ‘আমেরিকা মুর্দাবাদ’, ‘ইসরায়েল মুর্দাবাদ’ স্লোগান দিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদকরা পরে সেখানে গুলির শব্দ শুনেছেন এবং আশপাশের সড়কগুলোতে কাঁদুনে গ্যাস ছোড়া দেখতে পেয়েছেন।

বিক্ষোভকারীদের একাংশ বহির্ভাগের নিরাপত্তা স্তর অতিক্রম করার পর কনস্যুলেটের নিরাপত্তা রক্ষীরা গুলি ছুড়লে তারা পিছিয়ে যায়, বলেছেন স্থানীয় সরকারের এক মুখপাত্র সুখদেব আসসারদাস হেমনানি।

বিক্ষোভকারীর কনস্যুলেটের প্রধান ফটকের বাইরে একটি গাড়িতে আগুন দেয় এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়, বলেছেন তিনি।

“কনস্যুলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি আমরা। তারা সবাই নিরাপদে আছেন,” বলেন হেমনানি।

ইসলামাবাদের মার্কিন দূতাবাস এক্সে এক পোস্টে বলেছে, তারা বিক্ষোভের খবরের ওপর নজর রাখছে। পাকিস্তানে থাকা মার্কিন নাগরিকদেরকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বজায় রাখার পরামর্শও দিয়েছে তারা।

পরিস্থিতি প্রসঙ্গে রয়টার্স করাচির কনস্যুলেট ও ইসলামাবাদে মার্কিন দূতাবাসে যোগাযোগ করলেও তাদের দিক থেকে সাড়া পায়নি।

করাচিতে সহিংসতায় অন্তত ৩৪ জন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। হতাহতদের সবার গায়ে গুলির ক্ষত মিলেছে বলে জানিয়েছে করাচির সিভিল হাসপাতাল। এ ঘটনায় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে সিন্ধুর প্রাদেশিক সরকার।

ইরাকের বাগদাদে গ্রিন জোনে বিক্ষোভকারীদের প্রবেশ ঠেকাতে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রস্তুতি। ছবি: রয়টার্স

ইরাকের বাগদাদে গ্রিন জোনে বিক্ষোভকারীদের প্রবেশ ঠেকাতে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রস্তুতি। ছবি: রয়টার্স

জাতিসংঘের ভবনটি যেখানে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেই স্কারদু পাকিস্তানের গিলগিত-বালতিস্তান প্রদেশে অবস্থিত। দেশটির উত্তরের এই প্রদেশেই কেবল শিয়ারা সংখ্যাগরিষ্ঠ।

“বিপুল সংখ্যক বিক্ষোভকারী জাতিসংঘ কার্যালয়টির বাইরে জড়ো হয়েছিল এবং পরে তারা ভবনটি জ্বালিয়ে দেয়,” রয়টার্সকে এমনটাই বলেছেন স্থানীয় সরকারের মুখপাত্র সাব্বির মীর। সেখানে সহিংসতায় ১১ জন নিহত হয়েছে বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সরকারি ও এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

কালো পতাকা হাতে, ‘আমেরিকা মুর্দাবাদ’ ও ইসরায়েলবিরোধী স্লোগান দিয়ে পাকিস্তানের অন্যান্য শহরেও বিক্ষোভ হয়েছে। লাহোরে কয়েকশ বিক্ষোভকারী মার্কিন কনস্যুলেটের বাইরে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। সেখানে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও হালকা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে বাধ্য হয়ে কাঁদুনে গ্যাসও ছুড়তে হয়েছে।

পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি বিক্ষোভকারীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

“আপনাদের সঙ্গে সংহতি জানাচ্ছি আমরা,” ইরানের জনগণের মতো প্রত্যেক পাকিস্তানিও যে শোকাহত সে কথা জানিয়েছে বলেন নাকভি।

রাজধানী ইসলামাবাদে রেড জোন সংশ্লিষ্ট সব সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই রেড জোনেই যুক্তরাষ্ট্রসহ সব দেশের দূতাবাস ও মিশন অবস্থিত।

ওই রেড জোনের দিকে বিক্ষোভকারীরা অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ কাঁদুনে গ্যাস ও গুলি ছোড়ে। এতে দুইজন নিহত ও ১০ জনের মতো আহত হয়েছে বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন দুই কর্মকর্তা।

ভারতেও কাশ্মীর ও লখনৌসহ অনেক শহরে খামেনি হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। নিউ ইয়র্কেও ইরানে হামলার প্রতিবাদ জানিয়েছেন অনেকে।

নাইজেরিয়ার কানোতে কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী ইরানি পতাকা ও খামেনির ছবি নিয়ে মিছিল করেছেন। আফ্রিকার এ শহরটিতে অনেক শিয়া মুসলমানের বাস।

তবে পশ্চিমের বেশ কিছু দেশে, যেখানে নির্বাসিত ইরানির সংখ্যা বেশি সেখানে অনেককে রাস্তায় নেমে খামেনির মৃত্যু উদ্‌যাপন করতে দেখা গেছে।

প্যারিসে জড়ো হওয়া অনেকের হাতে দেখা গেছে তাদের প্রিয়জনদের ছবি, ইরানে কয়েক দশক ধরে চলা ধর্মীয় শাসন যাদের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। অনেকে উড়িয়েছেন ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের পতাকা।

লিসবনে নির্বাসিত ইরানিদের দেখা গেছে ইরানি দূতাবাসের বাইরে জড়ো হতে।

“গত রাতে আমরা পার্টি করেছি, রাত তিনটা পর্যন্ত। নেচেছি, স্লোগান দিয়েছি, গানের পর গান গেয়েছি, সত্যিই মজার ছিল। ইরানিরা ভোট দিতে যেতে চায় এবং তাদের পছন্দের সরকার বেছে নিতে চায়,” বলেছেন লিসবনের উদ্‌যাপনে থাকা ৫৭ বছর বয়সী ম্যাক্সিমিলিয়েন জাজানি।

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের পশ্চিমা মিত্ররা এ অভিযানের মাধ্যমে ইরানে শাসনব্যবস্থা বদলাতে চাইছে। তেহরানও পাল্টা সামরিক জবাব দিচ্ছে। খামেনির মৃত্যুর পর রাজধানীসহ ইরানের অনেক শহরে সরকারপন্থিদের বড় বড় সমাবেশ দেখা গেছে। কোথাও কোথাও সরকারবিরোধীরা আনন্দ করছেন বলে সোশাল মিডিয়ায় অল্প কিছু ভিডিও বা ছবি এলেও তার অনেকগুলোরই সত্যতা যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এখন পর্যন্ত দেশটির কোথাও সরকারবিরোধীদের বড় বিক্ষোভ বা কর্মসূচিরও খবর মেলেনি।

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ