শনিবার | ৩০ মে, ২০২৬ | ১৬ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ | ১২ জিলহজ, ১৪৪৭

মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলা

আপিল না করলে গ্রেপ্তার হলেই শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ের বিরুদ্ধে নির্ধারিত সময়ে (৩০ দিনের মধ্যে) আপিল না করলে গ্রেপ্তার হলেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম। তিনি বলেন, যদি তারা (দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান) ৩০ দিনের মধ্যে আপিল না করেন, তাহলে তারা গ্রেপ্তার হলে রায় কার্যকর হবে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার এ কথা বলেন।

এদিকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি ও ভারতের কাছে আসামি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরুর অপেক্ষায় দুই মন্ত্রণালয়। তবে রায় প্রকাশের এক দিন পরও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত-১-এর চেয়ারম্যানের অসুস্থতায় অনুলিপি এসব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে ভারতের রাজনৈতিক ও কূটনীতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, হাসিনাকে ফেরানেরা বিষয়টি অনেকটাই নির্ভর করছে ভারতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। তবে এ রায়ের ফলে শেখ হাসিনাকে নিয়ে দিল্লির অবস্থান আদৌ বদলাচ্ছে না এবং তাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ারও কোনো প্রশ্ন উঠছে না।

সোমবার জুলাই-আগস্ট আন্দোলন দমনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে একটি মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত-১।

ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে গতকাল সংবাদ ব্রিফিংয়ে প্রসিকিউটর গাজী মনোয়ার হোসেন তামীম বলেন, ট্রাইব্যুনাল আইনের ২১ নম্বর ধারায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের আপিলের অধিকার দেওয়া হয়েছে। এই ধারার ৩ উপধারায় বলা হয়েছে, দণ্ড ও সাজা প্রদান অথবা খালাস অথবা কোনো সাজা দেওয়ার তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হবে। এই সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার পর কোনো আপিল গ্রহণযোগ্য হবে না। আর ২১ নম্বর ধারার ৪ উপধারায় বলা হয়েছে, আপিল করার তারিখ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, দেশে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় দুটি পদ্ধতি আছে। একটা হলো যেসব আইনে আপিলের সময়সীমা উল্লেখ নেই, সে ক্ষেত্রে আপিলের সময়সীমা নির্ধারণ হয় তামাদি আইন অনুযায়ী। তামাদি আইন অনুযায়ী, যেসব আপিলের সময়সীমা নির্ধারণ হয়, সেখানে আপিলের সময় পেরিয়ে গেলেও তামাদি আইনের ৫ ধারা অনুসারে ডিলে কন্ডোনেশনের (বিলম্ব মার্জনার আবেদন) সুযোগ আছে; অর্থাৎ দণ্ডবিধিতে যদি কাউকে শাস্তি দেওয়া হয়, তিনি নির্ধারিত সময়ে আপিল না করলেও পরে এসে আপিলের জন্য বিলম্ব মওকুফের জন্য আবেদন করতে পারেন। কিন্তু বিশেষ আইনগুলোতে যেখানে আপিলের সময় আইনের মধ্যে বলা আছে, সে ক্ষেত্রে এই সময়সীমা পেরিয়ে গেলে বিলম্ব মার্জনার কোনো সুযোগ নেই; অর্থাৎ এই ৩০ দিন পার হয়ে গেলে ক্ষমা করার আবেদনেরই আর কোনো সুযোগ নেই। সরকার এটি তখন কার্যকর করবে।

প্রসিকিউটর তামীম আরও বলেন, ট্রাইব্যুনালে দণ্ডপ্রাপ্তদের আর কেউ কিছু চাইতে পারবেন না। ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক শেষ। এখন ট্রাইব্যুনালের কাছে তারা শুধু এই মামলার সার্টিফায়েড অনুলিপি চাইতে পারবেন, সাক্ষীর জবানবন্দির সার্টিফায়েড অনুলিপি বা যেসব নথি আছে, তা চাইতে পারবেন। তারা এখন যত চাওয়া, তা নিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল বিভাগে আপিল করতে পারবেন। আপিল ফাইলিং অবস্থায় জামিন চাইতে পারবেন।

এদিকে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের অনুলিপি সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানোর কথা থাকলেও আদালত-১-এর চেয়ারম্যান অসুস্থ থাকায় সম্ভব হয়নি। গতকাল মৃত্যুদণ্ডের রায়ের অনুলিপি স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা ছিল। রায়ের কপি হাতে পেলে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং ভারতের কাছে আসামি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করবে দুই মন্ত্রণালয়। কেন্দ্রীয় কারাগারে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক ও মামলার রাজসাক্ষী চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের কাছেও রায়ের অনুলিপি পাঠানোর কথা ছিল।

শেখ হাসিনাকে ফেরাতে ভারতে চিঠি দেওয়া হচ্ছে: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন গতকাল জানিয়েছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত পলাতক শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে ফেরত চেয়ে ভারতকে চিঠি এখনো পাঠানো হয়নি। তবে চিঠি প্রস্তুত হচ্ছে। আজকেই (গতকাল) পাঠানো হতে পারে। রায়ের কপি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাঠাবে না জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু নোট ভারবালের মাধ্যমে রায়ের বিষয়টি জানিয়ে শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের অনুরোধ করা হবে।

নয়াদিল্লির অবস্থান বদলাচ্ছে না: এদিকে ভারতের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা একাধিক সংবাদমাধ্যমকে আভাস দিয়েছেন, এ রায়ের ফলে শেখ হাসিনাকে নিয়ে দিল্লির অবস্থান আদৌ বদলাচ্ছে না এবং তাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ারও কোনো প্রশ্ন উঠছে না। শেখ হাসিনা ভারতে যাওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত তাকে আশ্রয় বা আতিথেয়তা দেওয়া নিয়ে ভারতের অবস্থান একই রকম আছে।

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সাজা ঘোষণার পরও ভারতের সে অবস্থান অপরিবর্তিতই থাকছে। এর অর্থ, তাকে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত বা ভারতের মাটিতে তাকে আপাতত রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে, এমন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

তবে এখন এ প্রশ্ন উঠতেই পারে, দুই দেশের মধ্যকার অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের যে দাবি বা অনুরোধ জানিয়েছিল, তার এখন কী হবে? এর সহজ উত্তর হলো—সেই চিঠি পাওয়ার পর বছর ঘুরতে চললেও ভারত সেটি নিয়ে এতদিন একেবারে চুপচাপ বসেছিল, কিন্তু এবারে হয়তো তা নিয়ে মুখ খোলার জন্য তাদের ওপর চাপ বাড়বে।

ঢাকায় ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আলজাজিরাকে বলেন, এবার আমরা হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানাইনি। একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা তাকে স্বাভাবিকভাবে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। কারণ তিনি তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ভারত তাকে থাকতে দিয়েছিল। কারণ, সেটা ছাড়া আর বিকল্প কী ছিল?

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, নয়াদিল্লি কীভাবে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে? তিনি (হাসিনা) কি বাংলাদেশে ফিরে যেতে পারবেন, বিশেষ করে এখন যখন তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে? তিনি ভারতের প্রতি বন্ধুত্বসুলভ ছিলেন এবং এ ব্যাপারে ভারতের নৈতিক অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।

পিনাক চক্রবর্তী আরও বলেন, এ সরকারের (বাংলাদেশ) অধীনে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানাপোড়েন থেকে যাবে। কারণ, তারা বারবার বলতে থাকবে, ভারত আমাদের কাছে হাসিনাকে ফেরত দিচ্ছে না।

তবে নয়াদিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক সঞ্জয় ভরদ্বাজ বলেছেন, ভারত এ ঘটনাকে (হাসিনার মামলা) বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর রাজনৈতিক প্রতিশোধ হিসেবে দেখছে।

ভারতের জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বলেন, হাসিনার বিষয়ে ভারত জটিলতার মধ্যে পড়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে তার প্রতি জনগণের ক্ষোভকে তারা উপেক্ষা করতে পারে না। তিনি বলেন, স্বাভাবিকভাবেই নয়াদিল্লি চাইবে, ভবিষ্যতে কোনো না কোনোভাবে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় ফিরুক। তিনি (হাসিনা) ভারতের জন্য সবসময়ই সর্বোত্তম পছন্দ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ভারতকে মানতে হবে, বাংলাদেশে হাসিনাকে আর কখনো সুযোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এর পরিবর্তে ভারতের উচিত, ঢাকার অন্য রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা।

শ্রীরাধা দত্ত বলেন, বর্তমানে আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু আমাদের অবশ্যই এ নির্দিষ্ট এজেন্ডা (হাসিনার প্রত্যর্পণ) ছেড়ে এগিয়ে যেতে হবে।’

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ

  • Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
     123
    45678910
    11121314151617
    18192021222324
    25262728293031