শনিবার | ৩০ মে, ২০২৬ | ১৬ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ | ১২ জিলহজ, ১৪৪৭

পরীক্ষার ফল খারাপ হওয়ায় ক্লাসে শিক্ষার্থীদের পেটালেন বাগছাস নেতা

জেলা প্রতিনিধি, রংপুর

অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার ফল খারাপ হওয়ায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অর্ধশত শিক্ষার্থীকে পেটানোর অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের (বাগছাস) রংপুর মহানগর কমিটির আহ্বায়ক ইমতিয়াজ আহমেদ ইমতির বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় একজন অভিভাবক থানায় জিডিও করেছেন।

নগরীর হারাটি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৪ সেপ্টেম্বর এই ঘটনা ঘটলেও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের চাপে শিক্ষার্থী-অভিভাকরা এতদিন মুখ খোলেননি। পরে বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ায় এলাকায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, ইমতিয়াজ ওই বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি। ৪ সেপ্টেম্বর তিনি বিদ্যালয়ে গিয়ে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার ফল শুনে ‘অকৃতকার্য’ শিক্ষার্থীদের ওপর ক্ষিপ্ত হন। এর পর একে একে তিনটি শ্রেণিকক্ষে ঢুকে অর্ধশত শিক্ষার্থীকে বেধড়ক বেত্রাঘাত করেন।

স্থানীয় অভিভাবক ও বিদ্যালয় সূত্র জানায়, গত ফেব্রুয়ারি মাসে হারাটি উচ্চ বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ আহমেদ। তখন তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রংপুর মহানগর কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কমিটি বিলুপ্ত হলে গত ১৮ জুলাই বাগছাসের রংপুর মহানগর কমিটির আহ্বায়ক হন। হারাটি উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত  ২৩০ শিক্ষার্থী রয়েছে।

মারধরের ঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী হারাটি এলাকার মাহতাবুল ইসলামে ছেলে শাহরিয়ার জানায়, ওই দিন টিফিন শেষে ক্লাস চলছিল। এমন সময় ইমতিয়াজ মোটরসাইকেলে বিদ্যালয়ে গিয়ে অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির কক্ষে যান। সেখানে উপস্থিতি ছাত্রছাত্রীদের কাছে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার ফল জানতে চান। যেসব শিক্ষার্থী ‘অকৃতকার্য’ হয়েছে, তাদের একে একে ডেকে বেত দিয়ে বেধড়ক পেটান। তখন শ্রেণিকক্ষে যেসব শিক্ষক ছিলেন, তারাও কোনো প্রতিবাদ করেননি।

মঙ্গলবার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. শাহরিয়ারের বাড়ি হারাটি গ্রামে গেলে সে বলে, ‘টিফিনের পর পঞ্চম ক্লাসে শিক্ষকসহ আমরা সবাই উপস্থিত ছিলাম। ক্লাস চলাকালে সভাপতি একটা বেত নিয়ে ঢুকে বলতেছেন, কে কে ফেল করছো, দাঁড়াও। আমরা দাঁড়ানোর পর এক এক করে প্রত্যেককে মেরেছে, মেয়েদেরও বাদ দেননি। মাইরে শরীরের অংশ লাল হয়ে গেছে। মারধর করতে করতে বেত ভেঙে ফেলেছে।
একই শ্রেণির শিমুল শর্মা জানায়, তাদের বই দেওয়া হয়েছিল গত এপ্রিলে। ক্লাস হয়েছিল অল্প কয়েক দিন। এ কারণে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা বেশি কঠিন ছিল। বই দেরিতে দেওয়া ও পাঠ্যক্রম নতুন সৃজনশীল হওয়ায় তাদের ক্লাসের অধিকাংশই ফেল করেছিল।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সভাপতি এসে এসব কিছু শোনেননি। তিনি শিক্ষার্থীদের বেধড়ক মারধর করেন।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দাবি, ওই দিন পঞ্চাশের বেশি শিক্ষার্থীকে পেটানো হয়। এর মধ্যে ১০ থেকে ১৫ শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়। জ্বর ও ব্যথা না কমায় শিক্ষার্থী আইরিন আক্তারকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুদিন ভর্তি রাখতে হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করে আইরিনের চাচা ইয়াকুব আলী বলেন, ‘অমন করি ছাওয়াক কেউ মারে! আইরিনের হাতসহ শরীর ফুলে যায়। সেই সঙ্গে প্রচণ্ড জ্বর আসায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয় সে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষক বলেন, আমাদের উপস্থিতিতে সেদিন শিক্ষার্থীদের পেটানো হয়। কিন্তু বিদ্যালয়ের সভাপতি বলে প্রতিবাদ করতে পারিনি।

অভিভাবক দুলাল মিয়া বলেন, বিষয়টি মেনে নেওয়ার মতো নয়। তবে পরবর্তী সময়ে তিনি ক্ষমা চেয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও মহানগর বিএনপির ৪ নম্বর ওয়ার্ডের যুগ্ম সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বলেন, এটা কোনোভাবেই শাসন নয়, শিক্ষার্থী নির্যাতন। একই সঙ্গে ফৌজদারি অপরাধ। প্রধান শিক্ষকের উচিত ছিল বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু তিনি তা না করে ঘটনাটি ধামাচাপা দিয়েছেন।

শিক্ষার্থীদের মারধরের বিষয়ে জানতে চাইলে ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, বিষয়টা এ রকম না। আমি স্কুলের সভাপতি হিসেবে ছয় মাস থেকে স্কুলে পরিশ্রম করছি, এখানকার শিক্ষার্থীরা যেন ভালো রেজাল্ট করে। ওদের ক্লাসের যেগুলো সমস্যা ছিল, সমাধান করেছি। সে জন্য একটু রাগারাগি করেছি, অন্য কিছু নয়। তবে এটা নিয়ে এলাকার কিছু ব্যক্তি ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করার চেষ্টা করেছিল। বিষয়টি মীমাংসা হয়েছে।

শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পেটানোর ঘটনাটি নিয়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ঘটনার দুদিন পর ক্ষুব্ধ অভিভাবক ও এলাকাবাসী বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে জবাব ও বিচার চান। ভুক্তভোগী একজন শিক্ষার্থীর অভিভাবক রংপুর নগরের পরশুরাম থানায় জিডি করেন।

তবে ঘটনার প্রায় ২০ দিন হলেও কোনো আইনি ব্যবস্থা নেননি প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমান। তিনি বলেন, ভালো রেজাল্টের জন্য পড়াশোনা করতে সভাপতি শিক্ষার্থীদের শাসন করেছিলেন, তেমন কিছু নয়। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের সম্মতিতে বিষয়টি মীমাংসা করে দিয়েছি।
এ বিষয়ে পরশুরাম থানার ওসি মাইদুল ইসলাম বলেন, ইমতিয়াজ আহমেদ সভাপতি হিসেবে স্কুলে গিয়ে শাসন করেছিলেন। এ ঘটনায় একজন অভিভাবক অনলাইনে জিডি করেন। সেই সময় বিদ্যালয়ে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল।

জানতে চাইলে রংপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুল হাই বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক নির্যাতনের কোনো সুযোগ নেই। হারাটি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিষয়টি জানাননি। খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ

  • Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
     123
    45678910
    11121314151617
    18192021222324
    25262728293031