লাখো মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে মহান বিজয় দিবস। বাঙালির শৌর্য–বীর্য ও বীরত্বে ভাস্বর এই গৌরবময় দিনের সাক্ষী হতে পৌষের প্রথম দিনের ভোরটা ছিল ব্যতিক্রমী। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার চাদরে ঘিরে রাখা হয় জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও আশপাশের এলাকা। কুয়াশা ভেদ করে বিজয়ের উল্লাসে ভোর থেকেই হাজারো মানুষ জড়ো হতে থাকেন স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে।
বিজয়ের ৫৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বর্ণিল আলোয় সাজানো হয় জাতীয় স্মৃতিসৌধ। কুয়াশাঘেরা ভোরের স্নিগ্ধ পরিবেশে লাল-সবুজের আলোকচ্ছটা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে তোলে।
জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিনের আনুষ্ঠানিকতা। মঙ্গলবার সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে রাষ্ট্রপতি জাতীয় স্মৃতিসৌধে প্রবেশ করে মূল বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি।
সকাল ৬টা ৫৬ মিনিটে শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর তিনিও শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে নীরবতা পালন করেন। এ সময় বাংলাদেশ সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত চৌকস দল রাষ্ট্রীয় অভিবাদন জানায় এবং বিউগলে করুণ সুর বেজে ওঠে। পরে তিনি উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, সেনা কর্মকর্তা, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।
সকাল ৭টা ৫ মিনিটে প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিরা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। ড. আসিফ নজরুল বলেন, “১৬ ডিসেম্বরের যে প্রত্যয় ছিল, সেই চেতনা থেকেই ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।”
তথ্য উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “আমাদের আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন সমাজ। সেই লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় গণঅভ্যুত্থান ঘটেছে। আমরা এখন নতুন করে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করতে চাই।” তিনি জানান, ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে, যা একই সঙ্গে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে এক ধরনের গণভোট হিসেবেও বিবেচিত হবে।
প্রধান উপদেষ্টাসহ ভিআইপিদের প্রস্থান শেষে জাতীয় স্মৃতিসৌধ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। হাতে লাল-সবুজের পতাকা ও গালে আঁকা জাতীয় পতাকা নিয়ে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষের ঢল নামে স্মৃতিসৌধে। ফুল, ব্যানার ও ফেস্টুনে ভরে ওঠে শহীদ বেদি। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠন, শিক্ষার্থী, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
এ সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস সাংবাদিকদের বলেন, “যারা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, তাদের ‘জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান’ আখ্যা দেওয়া হলে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করা হয়।” তিনি আরও বলেন, “একাত্তর ও চব্বিশ কখনোই তুলনীয় নয়।”
ডাকসুর পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানোর পর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা গত ৫৪ বছরে পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।” জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, “বিজয়ের ৫৫ বছরেও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা হয়নি, যা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার।”
সকাল থেকেই স্মৃতিসৌধ এলাকায় লক্ষ্য করা গেছে নির্বাচনি আমেজ। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থী ও তাঁদের কর্মী-সমর্থকেরা স্লোগানে মুখর করে তোলেন এলাকা।
গাজীপুর থেকে আসা কলেজছাত্রী নুপুর বলেন, “আমার নানা ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাঁদের আত্মত্যাগের লক্ষ্য আজও কেন পূরণ হলো না—এই প্রশ্ন আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায়।” বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “তিরিশ বছর পরেও আমি স্বাধীনতাকে খুঁজছি।”
সারাদিন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে ওঠে জাতীয় স্মৃতিসৌধ। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেওয়া হয় বহুস্তরের ব্যবস্থা।
১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে কেবল একটি দিন নয়—এটি বিজয়, স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের অবসান ঘটে এবং অর্জিত হয় কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। বিজয় দিবস বাঙালি জাতির প্রতিটি প্রজন্মকে দেশপ্রেম, ত্যাগ ও দায়বদ্ধতার চিরন্তন বার্তা স্মরণ করিয়ে দেয়।










