বৃহস্পতিবার | ২১ মে, ২০২৬ | ৭ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ | ৩ জিলহজ, ১৪৪৭

ভারতীয় মিডিয়ার বিশ্লেষণ

বিসিসিআইয়ের কাছে নতি স্বীকার না করায় মূল্য দিতে হলো বাংলাদেশকে

সংগৃহীত ছবি

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ক্ষমতার রাজনীতি নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল— বিশ্ব ক্রিকেটে টিকে থাকতে হলে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআইয়ের ইচ্ছার বাইরে যাওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত। সেই বাস্তবতার নির্মম শিকার হলো বাংলাদেশ।

২০২৬ সালের টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশকে কার্যত বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠেয় এই টুর্নামেন্টে নিরাপত্তাজনিত শঙ্কার কারণে ভারতের বাইরে ম্যাচ আয়োজনের অনুরোধ করেছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। তবে সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে আইসিসি। ফলস্বরূপ, বিশ্বকাপের মঞ্চেই জায়গা হলো না বাংলাদেশের। তাদেরকে বাদ দিয়ে নেয়া হলো স্কটল্যান্ডকে।

বিসিবির এই অবস্থানের পেছনে অন্যতম কারণ ছিল কলকাতা নাইট রাইডার্সের সঙ্গে বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমানের চুক্তি হঠাৎ করে বাতিল করে দেওয়া। উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হুমকির মুখে বিসিসিআইয়ের নির্দেশেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। যদিও কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। বিসিবির দাবি, এমন পরিস্থিতিতে পুরো দলকে ভারতে পাঠানো নিরাপদ নয়।

আইসিসি অবশ্য তাদের বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘বাংলাদেশ দল, কর্মকর্তা কিংবা সমর্থকদের জন্য ভারতে কোনো বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা হুমকি পাওয়া যায়নি।’ লক্ষণীয় বিষয় হলো— এই পুরো ঘটনায় টুর্নামেন্টের আয়োজক বিসিসিআইয়ের ভূমিকা আইসিসির বিবৃতিতে একবারও উল্লেখ করা হয়নি। যেন এটি শুধুই আইসিসি ও বিসিবির মধ্যকার দ্বন্দ্ব।

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআইও একই অবস্থান নিয়েছে। বোর্ডের সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া এ বিষয়ে বলেন, ‘এটি আমাদের এখতিয়ারভুক্ত নয়।’ তবে ক্রিকেটবিশ্বের বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড হিসেবে বিসিসিআই যে কোনো বড় সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে সক্ষম— তা অস্বীকার করার জায়গা নেই।

এর আগে ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে পাকিস্তানে খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল ভারত। সে সময় আইসিসি ভারতের আবেদন মেনে নিয়ে তাদের ম্যাচ দুবাইয়ে স্থানান্তর করে; কিন্তু একই দাবি যখন বাংলাদেশ তোলে, তখনই আইসিসি ‘নজির স্থাপন’, ‘নিরপেক্ষতা’ এবং ‘নৈতিকতা’র কথা বলে সতর্ক হয়ে ওঠে। এই দ্বিচারিতাই এখন বিতর্কের কেন্দ্রে।

এই অসঙ্গতির দিকটি তুলে ধরেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার জেসন গিলেস্পি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘ভারতের ক্ষেত্রে যা গ্রহণযোগ্য, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা কেন নয়?’ যদিও সমালোচনার মুখে সেই পোস্ট তিনি মুছে ফেলেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক বাস্তবতা। আইসিসির বার্ষিক আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে বিসিসিআইয়ের হাত ধরে। ফলে বিশ্বের শতাধিক সদস্য দেশের স্বার্থ দেখভাল করার কথা থাকলেও বাস্তবে সংস্থাটি এক দেশের আর্থিক প্রভাবেই পরিচালিত হচ্ছে।

বর্তমান আইসিসি চেয়ারম্যানের (জয় শাহ) অতীত ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তিনি আগে বিসিসিআইয়ের সেক্রেটারি ছিলেন এবং বর্তমানে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির শীর্ষ নেতার (অমিত শাহ) সন্তান। সমালোচকদের মতে, এতে আইসিসির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়া কেবল একটি ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্ত নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও ‘মাস্কুলার ন্যাশনালিজম’-এর প্রতিফলন। বিসিসিআইয়ের সঙ্গে দ্বন্দ্বে পড়ে এর আগেও পাকিস্তানকে মূল্য দিতে হয়েছে, এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো বাংলাদেশ।

বিশ্বকাপ শুরু হলে বাংলাদেশকে হয়তো খুব বেশি কেউ মনে রাখবে না। কারণ আধুনিক ক্রিকেটে স্মৃতি আর সম্মান নির্ভর করে অর্থনৈতিক প্রভাবের ওপর। শীর্ষ তিন দেশ— ভারত, ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বাইরে বাকিরা সহজেই উপেক্ষিত।

তবু প্রশ্ন থেকেই যায়— আইসিসি কি কোনোদিন নিজের ভূমিকা নিয়ে আত্মসমালোচনায় বসবে? নাকি ক্রিকেট পরিচালনার এই প্রতিষ্ঠানটি চিরকালই সবচেয়ে শক্তিশালী বোর্ডের সুরেই নাচবে?

সূত্র: দ্য ওয়াইয়ার।

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ

  • Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
     123
    45678910
    11121314151617
    18192021222324
    25262728293031