মঙ্গলবার | ২৬ মে, ২০২৬ | ১২ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ | ৮ জিলহজ, ১৪৪৭

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন

হাজার কোটি টাকার তেল পাইপলাইন ও মজুত সক্ষমতা ফেলে রেখেছে বাংলাদেশ

সাগরে বড় জাহাজ থেকে সরাসরি পাইপলাইনে তেল খালাস ও পরিবহনের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে আছে। ফলে মজুত সক্ষমতাও কাজে লাগছে না।

সিঙ্গেল পয়েন্ট ম্যুরিং বা এসপিএম প্রকল্পের নির্মাণকাজ ২০২৪ সালে শেষ হলেও এখনো অপারেটর নিয়োগ না হওয়ায় এটি চালু করা যায়নি। তেলের বাজারে অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে প্রকল্পটির গুরুত্ব নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

মহেশখালীতে নির্মিত ছয়টি স্টোরেজ ট্যাংকে দেশের প্রায় এক মাসের ক্রুড অয়েল ও এক সপ্তাহের ডিজেল মজুত রাখার সক্ষমতা থাকলেও সেগুলো খালি পড়ে আছে।

এই প্রকল্পের আওতায় বঙ্গোপসাগরে ভাসমান বয়া, তেল পরিবহনের জন্য প্রায় ২২০ কিলোমিটার পাইপলাইন এবং দুই লাখ টন ধারণক্ষমতার স্টোরেজ ট্যাংক নির্মাণ করা হয়েছে। এটি পুরোপুরি চালু হলে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব।

এসপিএম অবকাঠামোয় গভীর সমুদ্র থেকে মহেশখালীর পাম্পিং স্টেশন হয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারি পর্যন্ত ১১০ কিলোমিটার করে দুটি পৃথক পাইপলাইন রয়েছে। এছাড়া প্রায় ১০০ একর জায়গাজুড়ে পাম্পিং স্টেশন, ডিজেল জেনারেটর ও ছয়টি ট্যাংক নির্মিত হয়েছে।

ক্রুড অয়েলের জন্য তিনটি ট্যাংকের প্রতিটির ধারণক্ষমতা ৬০ হাজার কিলোলিটার বা ৪২ হাজার টন। ডিজেলের তিনটি ট্যাংকের প্রতিটির ধারণক্ষমতা ৩৬ হাজার কিলোলিটার বা প্রায় ২৫ হাজার টন। সবমিলিয়ে দুই লাখ টন তেল মজুত রাখা সম্ভব।

বর্তমানে গভীর সমুদ্র থেকে বড় জাহাজে তেল এনে ছোট জাহাজে করে কর্ণফুলী চ্যানেল দিয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে নেওয়া হয়। এতে এক লাখ টন তেল খালাসে সময় লাগে প্রায় ১১ দিন। অথচ পাইপলাইনে এই কাজ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সম্ভব।

এই আধুনিক পদ্ধতি চালু হলে সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি পরিবহনজনিত অপচয় কমবে এবং পরিবেশ সুরক্ষায় ভূমিকা রাখবে।

তবে প্রকল্পটি চালু না হওয়ার প্রধান কারণ অপারেটর নিয়োগে জটিলতা। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের আওতাধীন ইস্টার্ন রিফাইনারির তত্ত্বাবধানে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়।

তৎকালীন সরকারের সময়ে বিশেষ আইনে দরপত্র ছাড়াই প্রকল্প বাস্তবায়ন ও পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেই আইন বাতিল হওয়ায় নতুন করে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করতে হয়। ফলে সময়ক্ষেপণ হয় এবং এখনো অপারেটর নিয়োগ সম্পন্ন হয়নি।

প্রকল্পটি চালু হলে বছরে প্রায় ৯০ লাখ টন ক্রুড অয়েল ও ডিজেল খালাস ও পরিবহন করা সম্ভব। যদিও বর্তমান রিফাইনারি সক্ষমতায় এর প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যবহার করা যাবে। বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল পরিশোধনের সক্ষমতা রয়েছে।

ডিজেলের চাহিদা বেশি হওয়ায় বছরে ৪৫ লাখ টনের বেশি ডিজেল পরিবহন করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলমান সংকটে এই অবকাঠামো বড় ভূমিকা রাখতে পারত। এতে লাইটারেজ পদ্ধতির খরচ ও অপচয় কমানো যেত।

ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ তামিম বলেন, অগ্রাধিকার দিয়ে পদক্ষেপ নিলে বিলম্ব এড়ানো যেত। তার মতে, পাইপলাইন ব্যবস্থায় তেল পরিবহন দ্রুত, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব।

তিনি আরও বলেন, প্রকল্পটি চালু না থাকায় অর্থ সাশ্রয় ও মজুত সুবিধা থেকে দেশ বঞ্চিত হচ্ছে, অথচ ঋণের চাপ বহাল রয়েছে। দুই লাখ টনের এই মজুত স্থায়ী কৌশলগত মজুত হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম বলেন, পাইপলাইন পদ্ধতি আধুনিক, দ্রুত ও কম ব্যয়বহুল। এটি পড়ে থাকলে কেন এমন হচ্ছে তা খতিয়ে দেখা উচিত এবং দ্রুত চালুর উদ্যোগ নিতে হবে।

জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব মোর্শেদা ফেরদৌস জানান, দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চলছে এবং দ্রুত প্রকল্পটি চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে।

প্রকল্প পরিচালনার জন্য পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে নিজস্ব জনবল দিয়ে পরিচালনার পরিকল্পনা থাকলেও আপাতত কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে পরিচালনা করা হবে।

তবে ঠিক কবে প্রকল্পটি চালু হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ

  • Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
     123
    45678910
    11121314151617
    18192021222324
    25262728293031