অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর পূর্তির প্রেক্ষাপটে দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও খুচরা বাজারে প্রতিদিনই লাগামহীনভাবে বাড়ছে বিভিন্ন পণ্যের দাম। এতে নিম্নবিত্তের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জীবনধারা কঠিন হয়ে উঠেছে।
বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে তাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকা সংকুচিত করছে। মাছ-মাংস তো দূরের কথা, ডাল-ভাত আর সবজিই এখন অনেকের নাগালের বাইরে। পুষ্টির একমাত্র সহজলভ্য উৎস ডিমের দামও আবার ঊর্ধ্বমুখী।
রাজধানীর সূত্রাপুর, রায়সাহেব বাজার, নয়াবাজারসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, একেক দিন একেক দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে। শাকসবজি থেকে শুরু করে চাল, ডাল, তেল, ডিম, মুরগি ও মাছের দাম প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে।
বর্তমানে মোটা চাল কেজিতে ৬০ টাকা, সরু চাল ৯০ টাকা, মসুর ডাল ১৬০ টাকা, ডিম প্রতি হালি ৫০ টাকা, ব্রয়লার মুরগি ১৭০–১৮০ টাকা, গরুর মাংস ৭৫০–৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১২৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
সবজির বাজারেও অস্থিরতা প্রকট। শসা, বরবটি, পটোল, বেগুন, ঢ্যাঁড়সসহ বেশিরভাগ সবজির দাম ৮০–১৪০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। শীতের আগাম সবজি বাজারে এলেও দাম কমেনি।
চাষের রুই, কাতলা, তেলাপিয়া ও পাঙাশের দাম প্রতি কেজিতে ২০–৫০ টাকা বেড়েছে। নদীর চিংড়ি বিক্রি হচ্ছে ১০০০–১২০০ টাকা কেজিতে। সাধারণ পরিবারের জন্য এসব মাছ এখন ‘বিলাসিতা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ক্রেতা-বিক্রেতা, বিশ্লেষক ও বাজার সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করছেন, অদৃশ্য এক সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দামের বড় ব্যবধান সৃষ্টি করে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করা হচ্ছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর প্রতিদিন বাজার তদারকির দাবি করলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নেই বলেই মনে করছেন অনেকেই। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দুর্বল তদারকি, পরিবহন সমস্যা, ডলারের উচ্চ বিনিময় হার এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বাজার অস্থিরতার মূল কারণ।
সূত্রাপুর এলাকার গৃহপরিচারিকা মোরশেদা আক্তার জানান, মাসে ১৫ হাজার টাকা আয়ে সংসার চালানো দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। রিকশাচালক নূরউদ্দিন বলেন, “ভাড়া একটু বেশি নিলেই গালি খাই, কিন্তু বাজারে কিছুই তো কিনতে পারি না। আমাদের কথা কেউ শোনে না।”
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানান, বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কিছু পণ্যের দাম কমেছে, যেমন চাল, ডাল ও চিনি। তবে আবহাওয়া এবং মৌসুমি কারণে সবজির বাজার অস্থির রয়েছে।
তিনি বলেন, “সবজির বাজারে ট্রানজিশন পিরিয়ড চলছে। বৃষ্টির প্রভাব এবং পূজার কারণে সাময়িক সংকট তৈরি হয়েছে। তবে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং মনিটরিং জোরদার করতে কাজ চলছে।”
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (BIISS)-এর গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর বলেন, “মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, দুর্বল নীতিমালা, এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।”
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির ভূইয়া বলেন, “সরকারের তদারকি না থাকায় বাজারে সিন্ডিকেট সক্রিয়। বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি এবং দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।”










