বৃহস্পতিবার | ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ | ১৭ বৈশাখ, ১৪৩৩ | ১২ জিলকদ, ১৪৪৭

বিবিসির প্রতিবেদন

‘ভারতের কর্তৃপক্ষ আমাদের বন্দির মতো নৌকায় তুলল, তারপর সমুদ্রে ফেলে দিল’

ডেস্ক রিপোর্ট

মিয়ানমার থেকে ভিডিও কলে বিবিসির সঙ্গে সোয়েদ নূর (মাঝখানে) এবং আরও কয়েকজন শরণার্থী কথা বলেছেন। -ছবি : বিবিসি

নুরুল আমিন সবশেষ গত ৯ মে তার ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেছিলেন; ফোনকলটি ছিল খুব সংক্ষিপ্ত, কিন্তু যে খবর পেয়েছিলেন তা ছিল চরম আতঙ্ক, উদ্বেগের।

তিনি জানতে পারেন, তার ভাই কাইরুল ও আরও চার স্বজন ৪০ রোহিঙ্গার একটি দলে রয়েছেন, যাদের অবৈধভাবে মিয়ানমারে পাঠিয়ে দিয়েছে ভারত সরকার।

ফলে নুরুল তার পরিবারকে যে আবার দেখতে পাবে, সেই সম্ভাবনা এখন নেই বললেই চলে।

দিল্লিতে ২৪ বছর বয়সী নুরুল বিবিসিকে বলেন, “আমার মা-বাবা ও অন্যরা যে যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, সেটা সহ্য করতে পারছি না।”

নুরুলের স্বজন ও অন্য রোহিঙ্গাদের দিল্লি থেকে সরানোর তিন মাস পর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারার কথা লিখেছে বিবিসি। ওই রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগ এখন ‘বা হটু আর্মি’ (বিএইচএ) এর সঙ্গে রয়েছে। সশস্ত্র বিদ্রোহী এ গ্রুপটি মিয়ানমারের দক্ষিণ-পশ্চিমে লড়াই করছে।

“মিয়ানমারে আমরা নিরাপদ মনে করছি না। এটি পুরোপুরি যুদ্ধক্ষেত্র”, বিএইচএ এক সদস্যের মোবাইল ফোন থেকে ভিডিও কলে বলেন সৈয়দ নূর নামে আরেকজন। কাঠের তৈরি একটি আশ্রয়কেন্দ্র থেকে তিনি ভিডিওকলে কথা বলছিলেন। তার পাশে ছিলেন আরও ছয় শরণার্থী।

এসব শরণার্থীর বক্তব্য শোনার পাশাপাশি দিল্লিতে তাদের পরিবারের সঙ্গেও কথা বলেছে বিবিসি। শরণার্থীদের সঙ্গে ঘটা ঘটনা তদন্তে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও কথা বলেছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমটি লিখেছে, দিল্লি থেকে উড়োজাহাজে করে এই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বঙ্গোপসাগরের একটি দ্বীপে নেওয়া হয়। এরপর একটি নৌযানে উঠিয়ে ‘লাইফ জ্যাকেট’ পরিয়ে আন্দামান সাগরে জোর করে নামিয়ে দেওয়া হয়। ভাসতে ভাসতে এসব রোহিঙ্গারা গিয়ে ঠেকেন মিয়ানমারের তীরে। সেখানে এখন তারা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি।

২০১৭ সালের অগাস্ট থেকে ব্যাপক নির্যাতন, জাতিগত নিধনের মুখে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে পার্শ্ববর্তী ভারত ও বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় লাখ লাখ রোহিঙ্গা। তাদের মধ্যে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা মুসলিম আছেন বাংলাদেশে। তাদের নিজ দেশে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।

ভারতে আশ্রয় নেওয়া এই রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের বদলে অনেককে বিপজ্জনকভাবে মিয়ানমারের কাছাকাছি সাগরে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সেখান থেকে গিয়ে তারা উঠছেন গৃহযুদ্ধে জর্জরিত মিয়ানমারের তীরে।

রোহিঙ্গা যুবক নুরুল আমিনের ভাই কাইরুল (সবার বাঁয়ে) ও অন্যরা, যাদের ভারত থেকে সাগরপথে পাঠানো হয় মিয়ানমারে। ছবি: বিবিসি।

দিল্লি থেকে মিয়ানমারে পাঠানো রোহিঙ্গাদের একজন ঘটনার বর্ণনায় বিবিসিকে বলেন, “তারা আমাদের হাত বেঁধে, মুখ ঢেকে বন্দিদের মত করে নৌকায় তোলে। এরপর ফেলে দেয় সাগরে।”

দিল্লি থেকে এভাবে মিয়ানমারে পৌঁছানোর পরই জন তার ভাইকে ফোন করে ওই কথা বলেন।

নুরুল আমিন বলেন, “মানুষকে কীভাবে কেউ সাগরে ফেলে দিতে পারে? পৃথিবীতে মানবতা বেঁচে আছে, কিন্তু ভারত সরকারের মধ্যে আমি সেটা দেখিনি।”

মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতি সংক্রান্ত জাতিসংঘের বিশেষ দূত থমাস অ্যান্ড্রুজ বলছেন, অভিযোগগুলো প্রমাণের জন্য ‘যথেষ্ট প্রমাণ’ রয়েছে। জেনিভায় ভারতের মিশন প্রধানের কাছে বিষয়টি তিনি তুলে ধরেছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো জবাব পাননি।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করার কথা লিখেছে বিবিসি। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের আগ পর্যন্ত তারা কোনো সাড়া পায়নি।

রোহিঙ্গা অধিকারকর্মীরা প্রায়ই বলছেন, ভারতে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। দেশটি রোহিঙ্গাদের শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না, বরং নিজেদের আইন অনুযায়ী ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে গণ্য করে।

দিল্লি থেকে আন্দামান হয়ে মিয়ানমারে

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের হিসাবে, ভারতে ২৩ হাজার ৮০০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী নিবন্ধিত হয়েছেন। তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের অনুমান, সেখানে রোহিঙ্গাদের প্রকৃত সংখ্যা ৪০ হাজারের বেশি।

দিল্লিতে গত ৬ মে বায়োমেট্রিক ডেটা সংগ্রহের নামে ৪০ জন রোহিঙ্গাকে থানায় ডেকে নেওয়া হয়। তাদের ইউএনএইচসিআরের শরণার্থী কার্ড রয়েছে। তারা দিল্লির বিভিন্ন অংশে বাস করেন।

থানায় নিয়ে এই রোহিঙ্গাদের ছবি ও আঙুলের ছাপ নেওয়া হয়। প্রতি বছরই তাদের এভাবে বায়োমেট্রিক ডেটা নেয় ভারত সরকার। থানায় কয়েক ঘণ্টা অবস্থানের পর তাদের শহরের ‘ইন্দ্রলোক ডিটেনশন সেন্টারে’ নিয়ে যাওয়া হয়। ওই ৪০ জনের মধ্যে ছিলেন রোহিঙ্গা যুবক নুরুল আমিনের ভাই।

নুরুল আমিন বলেন, তার ভাই তখন তাকে ফোন করে বলেন, তাকে মিয়ানমারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। একজন আইনজীবী ডাকার পাশাপাশি ইউএনএইচসিআরকে বিষয়টি জানাতে নুরুলকে অনুরোধ করেন তিনি।

পরদিন ৭ মে শরণার্থীদের দিল্লির ঠিক পূর্বে হিন্ডন বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে উড়োজাহাজে করে নিয়ে যাওয়া হয় বঙ্গোপসাগরের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে।

সৈয়দ নূর বলেন, “উড়োজাহাজ থেকে নামার পর দুটি বাস আসে রোহিঙ্গাদের নিতে। বাসগুলোর গায়ে লেখা ছিল ‘ভারতীয় নৌসেনা’। আমরা বাসে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তারা কিছু প্লাস্টিকের জিনিস দিয়ে আমাদের হাত বেঁধে দেয়। কালো মসলিন কাপড় দিয়ে আমাদের মুখ ঢেকে দেয়।”

বাসে যারা ছিল, তারা পরিচয় না দিলেও তারা সামরিক পোশাকে ছিলেন। হিন্দিতে কথা বলছিলেন।

অল্প সময়ের যাত্রার পর বঙ্গোপসাগরে একটি জাহাজে তাদের তোলা হয়। এরপর সৈয়দ নুরদের হাত ও মুখ খুলে দেওয়া হয়। তাদের যে জাহাজে নেওয়া হয়, সেটি দুই তলা বড় যুদ্ধজাহাজ। দৈর্ঘ্য কমপক্ষে ১৫০ মিটার বা ৪৯০ ফুট।

মোহাম্মদ সাজ্জাদ নামে এক রোহিঙ্গা বলেন, জাহাজে থাকা অনেক লোকের পরনে ছিল টি-শার্ট, কালো ট্রাউজার আর কালো আর্মি বুট। সবাই একই পোশাক পরে ছিল না। কেউ কালো পোশাক পরেছিল, কেউ বাদামি রঙের পোশাকে ছিল।

সৈয়দ নুর বলেন, তারা ১৪ ঘণ্টা নৌবাহিনীর জাহাজে ছিলেন। তাদের নিয়মিত খাবার দেওয়া হয়। ভারতীয় খাবার যেমন- ডাল-ভাত ও পনির–ইত্যাদি।

৪০ জন রোহিঙ্গার দলের কেউ কেউ বলেছেন, জাহাজে তাদের নির্যাতন আর অপমানও করা হয়েছে।

সৈয়দ নুরের ভাষ্য, “আমাদের সঙ্গে খুব খারাপ আচরণ করা হয়। কাউকে কাউকে খুব বাজেভাবে মারধর করা হয়। একাধিকবার চড়ও মেরেছে।”

ভিডিও কলে ফয়াজ উল্লাহ তার ডান হাতের কব্জির ক্ষত দেখিয়ে বলেন, বারবার তার পিঠে ও মুখে থাপ্পড় মারা হয়। বাঁশের লাঠি দিয়ে খোঁচানো হয়।

পরদিন ৮ মে বড় যুদ্ধজাহাজ থেকে তাদের নামিয়ে উদ্ধারকারী ছোট নৌযানে তোলা হয়। দুটি বাহনে তাদের ২০ জন করে তোলা হয়। আরও দুটি নৌযান পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। সেখানে এক ডজনের বেশি কর্মকর্তা ছিলেন। হাত বাঁধা অবস্থায় এভাবে তারা সাত ঘণ্টার পথ অতিক্রম করেন।

সৈয়দ নুর বলেন, এরপর তাদের লাইফজ্যাকেট দিয়ে হাত খুলে দেওয়া হয় এবং বলা হয় পানিতে লাফ দিতে। পরের ১০০ মিটার তারা সাঁতরে তীরে গিয়ে ওঠেন। এরপর রোহিঙ্গাদের বলা হয়, তারা এখন ইন্দোনেশিয়ায়।

রোহিঙ্গাদের সেখানে পৌঁছে দিয়ে নৌবাহিনীর লোকজন চলে যায়।

বিবিসি লিখেছে, এই অভিযোগের বিষয়টি তারা ভারতীয় নৌবাহিনীকে অবহিত করেছে, তবে কোনো সাড়া পায়নি।

পরদিন ৯ মে ৪০ রোহিঙ্গাদের ওই দলটিকে স্থানীয় জেলেরা দেখতে পান। সেই জেলেরা তাদের বলেন, তারা এখন মিয়ানমারে। জেলেরা মোবাইল ফোন দিয়ে সাহায্য করেন। রোহিঙ্গাদের দলটি তখন ভারতে স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

 

সূত্র : বিবিসি

 

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ

  • Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
     12345
    6789101112
    13141516171819
    20212223242526
    27282930