| | |

যেভাবে ক্রিপ্টো জগতে ইঁদুর-বিড়াল খেলছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান!

সাভার ডেস্ক

ইরানের ওপর দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও তেহরানের মধ্যে এখন এক নতুন ধরনের ‘ক্রিপ্টো যুদ্ধ’ শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি এক ধরনের ইঁদুর-বিড়াল (ক্যাট-অ্যান্ড-মাউস) খেলা, যেখানে ইরান ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহার করে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে চাইছে, আর যুক্তরাষ্ট্র তা ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে।

যুদ্ধের আগেই ক্রিপ্টো সরিয়ে নেন ব্যবহারকারীরা : তেহরানের এক ক্রিপ্টো ব্যবহারকারী জানান, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার মাত্র ১২ ঘণ্টা আগে তিনি নিজের সব ডিজিটাল সম্পদ স্থানীয় প্ল্যাটফর্ম নোবিটেক্স থেকে সরিয়ে ব্যক্তিগত ওয়ালেটে রাখেন। তার আশঙ্কা ছিল, যুদ্ধ শুরু হলে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বা সাইবার হামলায় সেই অর্থ হারাতে পারেন।

দ্রুত বাড়ছে ইরানের ক্রিপ্টো অর্থনীতি : ব্লকচেইন বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান চেইনঅ্যানালাইসিস-এর তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরানের ক্রিপ্টো অর্থনীতির আকার দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এতে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, রাষ্ট্রীয় সংস্থাও বড় ভূমিকা রাখছে।

বিশেষ করে ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) একাই চতুর্থ প্রান্তিকে মোট ক্রিপ্টো লেনদেনের প্রায় ৫০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ক্রিপ্টো : বিশ্লেষকদের মতে, ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে ইরান তেল বিক্রি, অস্ত্র কেনা এবং বিভিন্ন পণ্য আমদানি করছে- যা প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকায় সহজে ট্র্যাক করা যায় না।

এমনকি হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজের কাছ থেকেও ক্রিপ্টোতে টোল নেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা ব্যবস্থা : এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রও বসে নেই। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগকারী সংস্থা ‘অফিস অফ ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (ওএফএসি)’ ইরান-সংশ্লিষ্ট একাধিক ক্রিপ্টো ওয়ালেটের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে প্রায় ৩৪৪ মিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ করেছে।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, “তেহরান যেভাবেই অর্থ সরানোর চেষ্টা করুক, আমরা তাদের সব আর্থিক উৎস লক্ষ্যবস্তু করবো।”

সাধারণ মানুষের ভোগান্তি : তবে এই ‘ক্রিপ্টো যুদ্ধের’ সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ ইরানিরাই। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞায় আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকায় তারা ক্রিপ্টোকে বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছেন।

ইরানি মুদ্রা রিয়ালের মূল্য ২০১৮ সালের পর প্রায় ৯০ শতাংশ কমে যাওয়ায় মানুষ তাদের সঞ্চয় রক্ষায় ক্রিপ্টোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, সাইবার হামলা, ইন্টারনেট সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক এক্সচেঞ্জগুলোর নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের জন্য ক্রিপ্টো ব্যবহার করাও কঠিন হয়ে উঠছে।

যুদ্ধের প্রভাব : যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পরপরই ক্রিপ্টো লেনদেনে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে। মাত্র কয়েক দিনে ১০ মিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ স্থানান্তর হয়েছে।

অন্যদিকে, ২০২৫ সালের জুনে একটি বড় সাইবার হামলায় নোবিটেক্স থেকে প্রায় ৯০ মিলিয়ন ডলারের ক্রিপ্টো চুরি হয়, যা ইসরায়েল-সম্পর্কিত একটি হ্যাকার গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত বলে ধারণা করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্রিপ্টোকারেন্সি এখন বৈশ্বিক ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী দেশ ও তা এড়িয়ে চলা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এই ডিজিটাল লড়াই আরও বাড়বে।

তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ‘ক্রিপ্টো রশি-টানাটানি’ শুধু অর্থনীতির নয়, ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণেও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

সূত্র: আল-জাজিরা

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ