ঢাকার সাভারে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে চলমান একটি উন্নয়ন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে এলাকাবাসীর কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। ড্রেন নির্মাণের নামে এই অর্থ সংগ্রহ করেছে একটি প্রতারক চক্র বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
জানা গেছে, স্থানীয় সরকারের কোভিড-১৯ প্রতিক্রিয়া ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের (এলজিসিআরআরপি) আওতায় বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে সাভার পৌরসভার জামসিং জয়পাড়া মহল্লায় ১ কোটি ৪৮ লাখ ৬০ হাজার ৭০০ টাকা ব্যয়ে ৮০০ মিটার ইউনিব্লক সড়ক এবং ৬৮ লাখ ৯৭ হাজার ৫৪০ টাকা ব্যয়ে ৩৫০ মিটার আরসিসি ড্রেন নির্মাণকাজ চলছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় তিন মাস আগে কাজ শুরুর সময় জয়পাড়া মহল্লার বাইতুল মামুর কেরামাতীয়া জামে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়, পৌরসভার প্রকৌশলীদের টাকা না দিলে ড্রেন নির্মাণকাজ হবে না। ওই ঘোষণার পর কয়েকজন ব্যক্তি বাড়ি বাড়ি গিয়ে ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করেন।
মসজিদের ইমাম নাজির আহমেদ বলেন, মসজিদের সেক্রেটারি খন্দকার ফরহাদ হোসেন ও কোষাধ্যক্ষ হাজী মো. শামসুদ্দিন তাকে মাইকিং করতে বলেন। পরে তিনি মসজিদের মাইকে এ ঘোষণা দেন।
অভিযোগ রয়েছে, খন্দকার ফরহাদ হোসেন, হাজী মো. শামসুদ্দিন, তার ছেলে মোহাম্মদ হাসান প্রিন্স এবং স্থানীয় বাসিন্দা জসিম উদ্দিন ও মাসুমসহ কয়েকজন ব্যক্তি এই অর্থ সংগ্রহ করেন।
পরে এলাকাবাসী জানতে পারেন, প্রকল্পটি সম্পূর্ণ বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং এ ধরনের কাজে স্থানীয়দের কাছ থেকে কোনো অর্থ নেওয়ার সুযোগ নেই। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর এলাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং টাকা ফেরতের দাবি ওঠে।
স্থানীয় বাসিন্দা ইমদাদুল হক বলেন, “আমাদের বলা হয়েছিল টাকা না দিলে বাড়ির সামনে ড্রেন হবে না। ধার-দেনা করে টাকা দিয়েছি। পরে জানতে পারি প্রকল্পটি বিশ্ব ব্যাংকের টাকায় হচ্ছে। মসজিদের মাইক ব্যবহার করে এভাবে প্রতারণা করা হবে, তা ভাবিনি।”
হাসিবুর রহমান বলেন, “ড্রেন ও রাস্তার কাজের খরচের কথা বলে আমার কাছ থেকেও ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে।”
গৃহবধূ মুন্নি আক্তার জানান, তিনি ২০ হাজার টাকা দিয়েছেন। পরে তার কাছে আরও ১০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। এছাড়া আকলিমা আক্তার ৩০ হাজার টাকা, স্কুলশিক্ষিকা নাসিমা আক্তার ২৫ হাজার টাকা এবং আব্দুল আলী ১০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আজাদ বলেন, “এলাকার মানুষ সহজ-সরল। সরকারি টাকায় রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণ হচ্ছে, সেটা না জানার সুযোগ নিয়ে তাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে।”
সড়ক ও ড্রেন নির্মাণকাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা সাভার পৌরসভার উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) তৌফিক ইমাম রূপক বলেন, “জয়পাড়া মহল্লায় ৮০০ মিটার ইউনিব্লক সড়ক নির্মাণ করছে সোয়েব কনস্ট্রাকশন এবং ৩৫০ মিটার আরসিসি ড্রেন নির্মাণ করছে ইমরান বিল্ডার্স। পুরো প্রকল্পটি বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এলাকাবাসীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে কাজ করার কোনো সুযোগ নেই।”
সাভার পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) মোহাম্মদ আলম মিয়া বলেন, “এই প্রকল্পে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। প্রকৌশলীদের নাম ব্যবহার করে কেউ টাকা সংগ্রহ করলে তা বেআইনি।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে খন্দকার ফরহাদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য না করে সরে যান। হাজী মো. শামসুদ্দিনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
তবে মোহাম্মদ হাসান প্রিন্স ও জসিম উদ্দিন টাকা সংগ্রহের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “ড্রেন নির্মাণের জন্য টাকা তোলা হয়েছে। টাকা পৌরসভার ইঞ্জিনিয়ার অফিসে দেওয়ার পরই ড্রেনের কাজ হচ্ছে।” তবে ওই অর্থ কাকে দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তারা কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, “টাকা নেওয়ার অভিযোগ পেয়েছি। কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”









