| | |

জাবি সিন্ডিকেটে রাষ্ট্রপতির মনোনীত সদস্য : আলোচনায় তিন বিএনপিপন্থী শিক্ষক

জাবি প্রতিনিধি

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেটে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত সদস্য হিসেবে কয়েকজন শিক্ষকের নাম আলোচনায় রয়েছে। তাঁদের মধ্যে ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. নাহরিন ইসলাম খান, দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড.মোস্তফা নাজমুল মানছুর এবং পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. জামাল উদ্দিনের নাম বেশি আলোচিত হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, তিন শিক্ষকই দীর্ঘদিন ধরে বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত।তবে তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন অধ্যাপক ড.নাহরিন ইসলাম খান।

অধ্যাপক ড. নাহরিন ইসলাম খান

ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক নাহরিন ইসলাম খান ছাত্রজীবন থেকেই জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জাহানারা ইমাম হল ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ২০১০ সালে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তাঁকে ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের International Visitor Leadership Program (IVLP)-এর জন্য মনোনীত করেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

অধ্যাপক ড. নাহরিন ইসলাম খান দীর্ঘদিন ধরে জাবি জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি তিনি একজন সুবক্তা, কলাম লেখক ও টেলিভিশন আলোচক হিসেবে পরিচিত। তাঁর প্রগতিশীল রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে জামায়াত-শিবিরপন্থী মহলের সমালোচনা ও আক্রমণের মুখে পড়েছেন অধ্যাপক নাহরিন ইসলাম খান। গত ৪ নভেম্বর,২০২৫ সিরাজগঞ্জে অধ্যাপক নাহরিন ইসলাম খানের বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগ এনে মামলা করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত সিরাজগঞ্জ-২ (সদর-কামারখন্দ) আসনের প্রার্থী ও জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যাপক জাহিদুল ইসলাম।

এছাড়া, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনে পক্ষপাতিত্ব ও অনিয়ম এবং একটি প্যানেলকে জয়ী করার উদ্দেশ্যে জামায়াতপন্থী একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যালট ছাপানোর অভিযোগের প্রতিবাদে তিনজন শিক্ষক তাৎক্ষণিকভাবে নির্বাচন বয়কট করেন। ওই তিন শিক্ষকের একজন ছিলেন অধ্যাপক নাহরিন ইসলাম খান।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন অধ্যাপক নাহরীন। পরে ২০১৩ সালে জার্মানির ফ্রাইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Environmental Governance বিষয়ে মাস্টার্স এবং ২০১৮ সালে মারবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Communication and Innovation বিষয়ে পিএইচডি অর্জন করেন।

তাঁর পেশাগত প্রোফাইলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফেলোশিপ ও বৃত্তির তথ্যও রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০১০ সালের DAAD Post-Graduation Scholarship, ২০১১ সালের Erasmus Mundus Grant–Gender Spring School, ২০১৪ সালের Cronstett Research Grant এবং ২০১০ সালের US Department of State-এর IVLP। এছাড়া ২০০৭ সালে University of Oldenburg-এ Alexander von Humboldt Fellowship এবং ২০০৫ সালে Asian Institute of Technology-এর Urban Management বিষয়ে Merit Award ও পেয়েছেন তিনি।

অধ্যাপক ড. মোস্তফা নাজমুল মানছুর (তমাল)

দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোস্তফা নাজমুল মানছুরের নামও সিন্ডিকেটের মনোনীত সদস্য হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের দাবি, কলেজজীবন থেকেই তিনি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

বর্তমানে তিনি জাবি জিয়া পরিষদের আহ্বায়ক এবং জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

অধ্যাপক মানছুর কানাডার University of Calgary থেকে পিএইচডি এবং Memorial University of Newfoundland থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা জানান, দীর্ঘদিনের ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতির পাশাপাশি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে। তিনি দীর্ঘ ফ্যাসীবাদী আমলে বিএনপির পক্ষে কলাম লিখেছেন এবং টেলিভিশন আলোচনাতেও অংশ নিয়েছেন।

অধ্যাপক মো. জামাল উদ্দিন (রুনু)

পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. জামাল উদ্দিনের (রুনু) নামও সিন্ডিকেটের মনোনীত সদস্য হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।

তিনি বর্তমানে জাবির শিক্ষার্থী কল্যাণ ও পরামর্শদান কেন্দ্রের পরিচালক এবং জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের কোনো পদে দায়িত্ব নিতে তিনি অনাগ্রহ প্রকাশ করলেও ৫ আগস্টের পর সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেন।

সূত্রটির আরও দাবি, অধ্যাপক জামাল উদ্দিন ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা বললেও কোনো কমিটিতে তাঁর পদে থাকার বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এছাড়া পিএইচডি ডিগ্রি না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্বের ক্ষেত্রে তিনি কিছুটা পিছিয়ে রয়েছেন বলে মনে করেন বিএনপিপন্থী কয়েকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক।

এদিকে, সম্প্রতি পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. শারমীন আক্তার শিমু ও অধ্যাপক জামাল উদ্দিনের একটি গবেষণাপত্রে ব্যাপকভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সিন্ডিকেট পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সঙ্গে তদবির করে ড. শারমীন আক্তার শিমুর নিয়োগ নিশ্চিত করতে ভূমিকা রেখেছিলেন অধ্যাপক জামাল উদ্দিন।

তবে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সিন্ডিকেটের মনোনীত সদস্য হিসেবে কাদের নাম চূড়ান্ত করা হবে, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত জানা যায়নি। জ্যেষ্ঠ বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের মতে, দীর্ঘদিনের ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে যারা জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যাদের উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও একাডেমিক অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং যারা বিতর্কমুক্ত, তাঁদেরই অগ্রাধিকার দিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত।

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted