| | |

সড়কে বর-কনেসহ নিহত ১৪

শোকে স্তব্ধ নাকশা গ্রাম

সাভার ডেস্ক

খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকশা গ্রামে আজ শুক্রবার (১৩ মার্চ) সকালে ঢুকতেই দেখা যায়, দলে দলে মানুষ এগিয়ে যাচ্ছেন একটি বাড়ির দিকে। কারও চোখে জল, কারও মুখে গভীর স্তব্ধতা। সবাই যাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা আবদুস সালাম মোড়লের বাড়িতে।

মাত্র দুই দিন আগেও এই বাড়িতে ছিল উৎসবের আমেজ। গত বুধবার রাতে ধুমধাম করে বিয়ে হয়েছিল আবদুস সালাম মোড়লের মেয়ে মার্জিয়া আক্তার মিতুর। বর বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার শ্যালাবুনিয়া গ্রামের আবদুর রাজ্জাকের ছেলে আহাদুর রহমান ওরফে সাব্বির। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে বরপক্ষের সদস্যরা সেদিন রাতে কনের বাড়িতে ছিলেন।

পরদিন বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নববধূকে নিয়ে মাইক্রোবাসে করে মোংলার উদ্দেশে রওনা দেয় বরপক্ষ। কিন্তু সেই যাত্রা আর গন্তব্যে পৌঁছায়নি। পথে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের বেলাই ব্রিজ এলাকায় মাইক্রোবাসটির সঙ্গে নৌবাহিনীর একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মাইক্রোবাসের আরোহী বর-কনেসহ ১৪ জন নিহত হন।

আজ সকালে আবদুস সালাম মোড়লের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির চারপাশ মানুষে পরিপূর্ণ। কেউ কাঁদছেন, কেউ আবার নীরবে দাঁড়িয়ে আছেন। নিহত কনে মার্জিয়া আক্তারের মা মুন্নি খাতুন কাঁদতে কাঁদতে বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। ঘরের বারান্দায় তাঁকে শুইয়ে দিয়ে কয়েকজন নারী পাশে বসে বিলাপ করছেন। বাড়ির উঠানে তখনো দাঁড়িয়ে আছে বিয়ের প্যান্ডেলের জন্য পুঁতে রাখা বাঁশ।

ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মার্জিয়া আক্তারের ফুফু মঞ্জুয়ারা বেগম চোখ মুছতে মুছতে বলেন, ‘আমি নিজে মেয়েটার হাতে চুড়ি পরাই দিছিলাম। সবাই মিলি একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করিছি। বিয়ের দিন কত্তো আনন্দ ছিল! অথচ আজকি সেই মেয়ের লাশ দেখতি হচ্ছে। শুধু মার্জিয়া নয, ওর ছোট বোনটাও চইলে গেল। দাদি-নানি দুজনও একসঙ্গে মারা গেছে।’

স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে ছিল আবদুস সালাম মোড়লের সংসার। স্থানীয় বাজারে মুরগি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি।

মার্জিয়া আক্তার নাকশা আলিম মাদ্রাসার আলিম প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর ছোট বোন লামিয়া মাদ্রাসার ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত।

বাড়ির পেছনের পারিবারিক কবরস্থানে গিয়ে দেখা যায়, পাশাপাশি খোঁড়া হয়েছে তিনটি কবর। কবরস্থানের পাশে বিলের ধারে খাটিয়ায় সাদা কাপড়ে ঢাকা ছিল তিনটি মরদেহ। সেখানে কয়েকজনের কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে বিলাপ করছিলেন আবদুস সালাম মোড়ল।

সকাল ১০টার দিকে মার্জিয়া আক্তার মিতু, তাঁর ছোট বোন লামিয়া আক্তার ও দাদি রাশিদা বেগমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে হাজারো মানুষ অংশ নেন।

আমাদী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘আমাদের এলাকায় এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা আগে দেখিনি। একসঙ্গে দুই মেয়ে, মা আর শাশুড়িকে হারিয়ে সালাম মোড়লের কান্না থামানো যাচ্ছে না। আমরাও তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা পাচ্ছি না।’

বাগেরহাটের কাটাখালী হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাফর আহমেদ বলেন, মাইক্রোবাসটিতে চালকসহ ১৫ জন ছিলেন। দুর্ঘটনায় ১৪ জন মারা গেছেন। একজন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ