শুক্রবার | ১২ জুন, ২০২৬ | ২৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ | ২৫ জিলহজ, ১৪৪৭

বাজেট ২০২৬-২৭

পুনরুদ্ধার থেকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির স্বপ্ন

সাভার ডেস্ক

মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে মানুষকে স্বস্তি দেওয়া, বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানো এবং অর্থনীতিকে আরও উৎপাদনমুখী ও বিকেন্দ্রীভূত করার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এ বাজেট বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হয়।

‘অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য নিয়ে প্রণীত এ বাজেটের আকার দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় এর আকার বেড়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। এটি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারেরও প্রথম জাতীয় বাজেট। ফলে অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবেও বাজেটটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।

অর্থমন্ত্রী প্রায় ২৩৪ পৃষ্ঠার বাজেট বক্তব্যে সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন, অগ্রাধিকার এবং আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা ও বৈশ্বিক অস্থিরতার বাস্তবতা সামনে রেখেই এবারের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সর্বোপরি ন্যায্যতাকে বিবেচনায় নিয়ে আমরা পরিকল্পনা করেছি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করেছি।’

অর্থমন্ত্রী জানান, অর্থনীতিকে আরও উৎপাদনমুখী, কর্মসংস্থান ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ধারায় এগিয়ে নিতে সরকার বিভিন্ন খাতে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্নের কথা তুলে ধরেন, যেখানে উদ্যোগ ও উদ্ভাবন উৎসাহিত হবে, পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হবে এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুফল সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাবে।

অর্থনীতিতে টেকসই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। বাজেট বক্তব্যের শুরুতেই আগামী দিনের অর্থনৈতিক রূপরেখা তুলে ধরে ১০টি অগ্রাধিকার খাতের কথা উল্লেখ করেন। এর মধ্যে রয়েছে সবার জন্য উন্নয়ন, সার্বজনীন শিক্ষা, বিনিয়োগ নির্ভর ও কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতি, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ।

গত কয়েক বছর ধরে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা ছিল নিত্যপণ্যের দাম। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সরকারের নীতিগত লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়ন, বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর লক্ষ্যও বাজেটে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। অর্থমন্ত্রী জানান, জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসাসামগ্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমাতে কর ও শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, এসব পদক্ষেপের ইতিবাচক প্রভাব বাজারে পড়বে এবং ভোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন।

বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিনিয়োগ ও ব্যবসা পরিবেশ উন্নয়ন। ব্যবসা পরিচালনা সহজ করা, বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কর ও শুল্ক কাঠামোকে আরও ব্যবসা বান্ধব করা, বিভিন্ন সরকারি সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা, লাইসেন্স ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং অনলাইনভিত্তিক সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।

সরকারের আশা, এসব পদক্ষেপ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যেও বারবার ফিরে এসেছে কর্মসংস্থানের বিষয়টি। তাঁর মতে, উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব নয়।

আগামী অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১০ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৯১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়ন, করজাল সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তি নির্ভর সেবা বাড়ানোর উদ্যোগও বাজেটে গুরুত্ব পেয়েছে।

করদাতাদের জন্য বড় পরিবর্তন হিসেবে আগামী অর্থবছর থেকে সারা বছর আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। আগে রিটার্ন জমা দিলে কর ছাড়ের ব্যবস্থাও থাকছে। সরকারের মতে, এতে কর পরিপালন বাড়বে এবং কর ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে।

উন্নয়ন ব্যয়ে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি প্রস্তাব করা হয়েছে এবারের বাজেটে। মোট উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা, যার মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ ছিল ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে তা বাড়িয়ে ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয়ের অংশ কমিয়ে ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

সামাজিক সুরক্ষা খাতেও নতুন উদ্যোগের ঘোষণা এসেছে। নিম্ন আয়ের ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বেশ কিছু নতুন কর্মসূচি এবারের বাজেটে যুক্ত হয়েছে। বরাদ্দের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাত সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এর মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস এবং ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। অভ্যন্তরীণ ঋণের মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ৬ হাজার কোটি টাকা কম।

বাজেট বক্তব্যের শেষ অংশে অর্থমন্ত্রী দেশের কৃষক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী, নারী, তরুণ, পেশাজীবী ও প্রবাসীদের সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি বলেন, জনগণের শক্তি, সৃজনশীলতা ও উদ্যোগই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি স্বনির্ভর, মর্যাদাবান ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।

সংখ্যার বিচারে এটি দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট। তবে বাজেটের মূল বার্তা শুধু ব্যয়ের আকারে নয়; বরং মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ব্যবসা সহজ করা এবং উন্নয়নের সুফলকে আরও বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকারে। নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে এটি আগামী কয়েক বছরের অর্থনৈতিক পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপরেখা হিসেবেই বিবেচিত হবে।

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ

  • Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
    1234567
    891011121314
    15161718192021
    22232425262728
    2930