আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় তৈরি পোশাক কারখানায় সিলিন্ডারবাহী কাভার্ড ভ্যানে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় চিকিৎসাধীন আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে এ ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ জনে।
মঙ্গলবার সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুর ইসলাম (৪০) নামের এক গাড়িচালকের মৃত্যু হয়। ঢামেক বার্ন ইউনিটের আবাসিক চিকিৎসক ডা. হারুন অর রশিদ মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, নুর ইসলামের শরীরের ৯৫ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। তাঁর গ্রামের বাড়ি বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার দিঘরাজ এলাকায়।
এর আগে রোববার সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় প্রীতি গ্রুপের প্রীতি কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেডের কারখানা চত্বরে গ্যাসভর্তি একটি কাভার্ড ভ্যানে বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের পর আগুন আশপাশে থাকা আরও কয়েকটি সিলিন্ডারবাহী গাড়িসহ অন্তত ৭ থেকে ৮টি গাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে।
এ ঘটনায় ঘটনাস্থল ও এর আশপাশে ছয়জন নিহত হন। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও দুজনের মৃত্যু হয়। মঙ্গলবার নুর ইসলামের মৃত্যুতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৯ জনে দাঁড়াল। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ জন।
বিস্ফোরণের পর একাধিক সিলিন্ডার ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ গজ দূরের আবাসিক এলাকা ও বিভিন্ন ভবনের ছাদে গিয়ে পড়ে। কোনো কোনো সিলিন্ডার টিনের চালা ফুটো করে ঘরের ভেতরেও ঢুকে যায়।
জামগড়ার রানা হোটেলের মালিক মো. হালিম জানান, বিস্ফোরণের সময় একটি সিলিন্ডার তাঁর ছেলের মাথায় এসে আঘাত করে। পরে তাঁকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হলেও মাথায় আঘাতের অবস্থা জানতে সিটিস্ক্যান করানোর পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসক।
ঘটনার পর রানা হোটেলের টিনের চালা ভেদ করে পড়ে থাকা একটি সিলিন্ডার দুপুরে স্থানীয় লোকজনের নজরে আসে। সিলিন্ডারটির গায়ে ইংরেজিতে লেখা রয়েছে—‘অ্যাপ্রোভড পিআরডি, সিএনজি অনলি, ডু নট ইউজ আফটার ২০২১’।
স্থানীয়দের দাবি, সিলিন্ডারটির মেয়াদ ২০২১ সালেই শেষ হয়েছে। তবে সিলিন্ডারটি মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল কি না, তা তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
ঘটনার পর চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস। জিরাবো ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার শাহাবুদ্দিন বলেন, সিলিন্ডারটি মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল কি না এবং বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ কী—তদন্ত শেষে তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।
ফায়ার সার্ভিস ঢাকা উত্তরের জোন-৪-এর উপসহকারী পরিচালক হাফিজুর রহমান বলেন, প্রাথমিক তদন্তে দুর্ঘটনার কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অধিকতর তদন্তের জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শেষে দুর্ঘটনার মূল কারণ জানানো হবে।
ঘটনাস্থলে গিয়ে আশুলিয়া রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মহিবুল্লাহ আকনও একটি সিলিন্ডার দেখেন। তিনি বলেন, সিলিন্ডারের গায়ে থাকা তথ্য অনুযায়ী সেটির মেয়াদ সম্পর্কে যে বিষয়টি বলা হচ্ছে, তা ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারাই তদন্ত করে নিশ্চিত করতে পারবেন।
শিল্পকারখানায় সিলিন্ডারে সিএনজি ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন
আশুলিয়া ডেন্ডাবর তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির কর্মকর্তা আবু সালে মো. খাদেম উদ্দিন বলেন, সিএনজি স্টেশন থেকে পরিবহনযোগ্য সিলিন্ডারে গ্যাস নিয়ে শিল্পকারখানা বা গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার নিষিদ্ধ। তবে বিভিন্ন সিএনজি স্টেশন থেকে এভাবে গ্যাস সংগ্রহ করে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তাঁর দাবি, প্রীতি গ্রুপের কারখানাগুলোতেও সিলিন্ডারে গ্যাস এনে ব্যবহার করা হতো। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তিতাসের নজর এড়াতে সিলিন্ডারগুলো কাভার্ড ভ্যানে করে আনা-নেওয়া করা হতো।
ব্যাবস্থাপক মো. আল আমিন বলেন, সিএনজি স্টেশন থেকে পরিবহনযোগ্য সিলিন্ডারে গ্যাস নিয়ে কারখানাসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ধরনের ব্যবহারের কারণে মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনা ঘটছে।
তিনি বলেন, পরিবহনযোগ্য কোনো সিলিন্ডারে যাতে সিএনজি স্টেশন থেকে গ্যাস সরবরাহ বা বিক্রি করা না হয়, সে জন্য দেশের সব সিএনজি স্টেশনকে চিঠি দিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। এরপরও কিছু স্টেশন অধিক মুনাফার আশায় শিল্পকারখানা ও বাসাবাড়ির জেনারেটর চালানোর জন্য এসব সিলিন্ডারে গোপনে গ্যাস সরবরাহ করছে।
এ ঘটনায় সোমবার দিবাগত রাতে আশুলিয়া থানায় মামলা হয়েছে। থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবু তালেব বাদী হয়ে মামলাটি করেন। পুলিশ জানিয়েছে, মামলাটি অপরাধজনক নরহত্যার ধারায় করা হয়েছে।
মামলায় প্রীতি গ্রুপের দায়িত্বশীল ছয়জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে।
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বলেন, সোমবার রাত ১২টার পর মামলাটি করা হয়।
শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে শিল্প পুলিশও কাজ করছে। বিস্ফোরণের সুনির্দিষ্ট কারণ এবং কারখানায় এভাবে গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম বা দায় ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।









