| | |

চট্টগ্রাম ওয়াসার জমি নিয়ে বর্তমান চেয়ারম্যানের ‘আয়নাবাজি: ২২ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের (ওয়াসা) পয়ঃনিষ্কাশন (স্যুয়ারেজ) প্রকল্পের জন্য সরকারের অধিগ্রহণ করা ৯৫৭ শতক (প্রায় ৯.৫৭ একর) জমি ব্যাংকে বন্ধক রেখে কোটি কোটি টাকার ঋণ হাতিয়ে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, জালিয়াতি ও ভুয়া দলিলের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় এই বিপুল সম্পত্তি বন্ধক রেখে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ থাকা মেসার্স আজমির ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়াকেই সম্প্রতি চট্টগ্রাম ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ঋণ খেলাপি হওয়ায় ওই জমি নিলামে তুলতে ব্যাংক যখন বিজ্ঞপ্তি জারি করে, তখন স্বয়ং চট্টগ্রাম ওয়াসা চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল—জমিটি তাদের নিজস্ব অধিগ্রহণকৃত সম্পত্তি এবং তা আত্মসাতে ভুয়া দলিল তৈরি করা হয়েছে। অথচ সেই ব্যক্তিকেই খোদ ওয়াসার শীর্ষ পদে বসানোয় চট্টগ্রামজুড়ে নজিরবিহীন তোলপাড় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ওয়াসা বোর্ডের নতুন চেয়ারম্যান ও সরকারি প্রজ্ঞাপনগত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ (পানি সরবরাহ-৩ শাখা) থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে পটিয়ার ছনহরা গ্রামের বাসিন্দা মৃত সিদ্দিক আহমদের ছেলে মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়াকে চট্টগ্রাম ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে ৩ বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। উপসচিবের পক্ষে সিনিয়র সহকারী সচিব মোছাঃ আখতারুন নেছা স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে ‘পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর ৭(১) ধারা অনুযায়ী এ নিয়োগ অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়। নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সরকারের এই শীর্ষ পদে আসীন হওয়া মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়াই মেসার্স আজমির ট্রেডিংয়ের নামে চট্টগ্রাম ওয়াসার মেগা প্রকল্পের জমি বন্ধক রেখে ২২ কোটি টাকার বেশি ব্যাংক ঋণ নিয়েছিলেন।

ঋণের জালে পুরো পরিবার:
প্রতিষ্ঠান ও দায়দেনাইউনিয়ন ব্যাংক লিমিটেডের খাতুনগঞ্জ শাখার নথিপত্র ও নিলাম বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, খাতুনগঞ্জের ১১৭ আমির মার্কেট (হাসান চেম্বার, ২য় তলা) ঠিকানার প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স আজমির ট্রেডিং’-এর নামে এই বিপুল অংকের ঋণ সুবিধা নেওয়া হয়। এই ঋণের সঙ্গে মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়ার পরিবারের একাধিক সদস্য সরাসরি জড়িত। মেসার্স আজমির ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী, মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া জমির মালিক, বন্ধকদাতা ও মূল জামিনদার। তার স্ত্রী আলীউননেছা খাতুন প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম জামিনদার। ঋণের অন্যতম বন্ধকদাতা ও জামিনদার মোহাম্মদ ইব্রাহীম হাসান। তিনি আবার ইদ্রিস মিয়ার সন্তান। সালমা বেগম নামে এক নারী এই ঋণের বন্ধকদাতা ও জামিনদার হিসেবে যুক্ত রয়েছেন। ব্যাংকের হিসাব বিবরণী অনুযায়ী, ০৮ নভেম্বর ২০২০ পর্যন্ত মেসার্স আজমির ট্রেডিংয়ের কাছে ইউনিয়ন ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখার আসল, লভ্যাংশ ও অন্যান্য চার্জসহ মোট অনাদায়ী পাওনার পরিমাণ দাঁড়ায় ২২ কোটি ২৩ লাখ ৬২ হাজার ৬২২ টাকা ৪৫ পয়সা। ওয়াসার জমি নিলামে তোলার উদ্যোগদীর্ঘদিন খেলাপি ঋণ পরিশোধ না করায় অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ (সংশোধিত ২০১০)-এর ১২(৩) ধারা অনুযায়ী ২০২০ সালের ১২ নভেম্বর বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রয়ের নিলাম বিজ্ঞপ্তি জারি করে ইউনিয়ন ব্যাংক লিমিটেডের খাতুনগঞ্জ শাখা (যা ১৫ নভেম্বর ২০২০ তারিখে চট্টগ্রামের স্থানীয় দৈনিক আজাদী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়)। নিলামে বিক্রির জন্য দুটি তফসিলভুক্ত সম্পত্তি তালিকাভুক্ত করা হয়- ১ম তফসিল: চট্টগ্রাম জেলার বন্দর থানাধীন মধ্য হালিশহর মৌজার (জেএল নং-১) আরএস ৪৫০২ ও ৫২৯২/১ খতিয়ানের আরএস ১১১, ১১২, ১১১/১৩৭, ১১১/১৩৮, ১১১/১২৯ দাগ এবং বিএস ৫ খতিয়ানের বিএস ১৯২৪, ১০৭ ও ১০৫ দাগের মোট ৯৫৭.০০ শতক (৯.৫৭ একর) জমি। ২য় তফসিল: কোতোয়ালী থানাধীন পাথরঘাটা মৌজার ৩১২ খতিয়ানের বিএস ১১৫০ দাগে ৩ তলাবিশিষ্ট ৬,৩০০ বর্গফুটের বাণিজ্যিক ভবনসহ ৫ শতক জমি।

চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রতিবাদ ও সতর্কবার্তা :
দৈনিক আজাদীতে ইউনিয়ন ব্যাংকের নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরপরই চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্তৃপক্ষের মধ্যে চরম তোলপাড় শুরু হয়। ২০২০ সালের ২৯ নভেম্বর চট্টগ্রাম ওয়াসার তৎকালীন সচিব শারমিন আলম স্বাক্ষরিত একটি কড়া দাপ্তরিক চিঠি (স্মারক নং: ৪৬.০৬.০০০০.১০৬.৭.৪৩.তা-৫.১৮০(৩)) পাঠানো হয় ইউনিয়ন ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক বরাবর। চিঠিতে ওয়াসা স্পষ্ট ভাষায় জানায়: নিলাম বিজ্ঞপ্তির ১নং তফসিলে বর্ণিত বন্দর থানাধীন মধ্য হালিশহর মৌজার বিএস ১০৫, ১০৭ ও ১৯২৪ দাগের সম্পূর্ণ সম্পত্তি চট্টগ্রাম ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্পের জন্য এল এ (ভূমি অধিগ্রহণ) মামলা নং-২২৫/১৯৬২-১৯৬৩ ইং মূলে অধিগ্রহণকৃত সরকারি সম্পত্তি। বিজ্ঞপ্তিতে বর্ণিত সালমা বেগমসহ একটি স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যমূলকভাবে মামলা-মোকদ্দমা দায়ের এবং জাল-ফেরেবি দলিল তৈরি করে সরকারি সংস্থা চট্টগ্রাম ওয়াসার অধিগ্রহণকৃত জমি আত্মসাতের অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ওই জমি নিয়ে ইতিপূর্বে চট্টগ্রাম ওয়াসা ২০০৬ ও ২০১১ সালে একাধিক জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিকে (দৈনিক আজাদী ও দৈনিক পূর্বকোণ) জনসাধারণের উদ্দেশ্যে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল। ওয়াসা সচিব ইউনিয়ন ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে ওয়াসার সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়, নিলাম ও হস্তান্তর সংক্রান্ত যাবতীয় অপচেষ্টা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। এই চিঠির অনুলিপি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক এবং ইউনিয়ন ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছেও পাঠানো হয়েছিল।

ব্যাংকের ভূমিকা ও আইনগত প্রশ্ন
একটি তফসিলি ব্যাংক কীভাবে সরকারি একটি সংস্থার স্যুয়ারেজ প্রকল্পের অধিগ্রহণকৃত ৯৫৭ শতক জমি যাচাই-বাছাই ছাড়া বন্ধক নিয়ে ২২ কোটি টাকার বেশি ঋণ ছাড় করল, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। ব্যাংক সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী, কোনো স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক নেওয়ার পূর্বে তার মূল মালিকানা স্বত্ব, নামজারি, ডিসিআর এবং সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের রেকর্ড গভীরভাবে যাচাই (Search & Title Verification) করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ ইউনিয়ন ব্যাংক রহস্যজনক কারণে সরকারি অধিগ্রহণ করা জমির ওপর মেসার্স আজমির ট্রেডিংকে বিপুল অঙ্কের ঋণ সুবিধা দেয় এবং পরে তা নিলামে তোলার বিজ্ঞপ্তি জারি করে।

রক্ষকই যখন ভক্ষক:
স্বার্থের সংঘাত ও ক্ষোভ যে ব্যক্তি ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে সরকারি সংস্থা ওয়াসার প্রায় পৌনে ১০ একর জমি জাল দলিলের মাধ্যমে বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার দালিলিক প্রমাণ রয়েছে, সেই ব্যক্তিকেই স্বয়ং চট্টগ্রাম ওয়াসার পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করায় পুরো প্রশাসনিক ও সুশীল সমাজে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রাম ওয়াসার কর্মকর্তাদের একাংশের মতে, স্যুয়ারেজ প্রকল্পের জমি নিয়ে যেখানে ওয়াসার স্বার্থ সরাসরি জড়িত, সেখানে এই জমি জালিয়াতি চক্রের মূল সুবিধাভোগীকে প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক বানানোয় ওয়াসার চলমান স্যুয়ারেজ প্রকল্প এবং হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি রক্ষা এখন চরম হুমকির মুখে পড়বে।

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted