| | |

যে কারণে অন্যরকম এবারের বিশ্বকাপ

বিশ্বফুটবলের অভিভাবক সংস্থা ফিফা’র সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো যাকে ‘মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম আয়োজন’ বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেই মেগা বিশ্বকাপ অবশেষে মাঠে গড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডার যৌথ আয়োজনে প্রথমবারের মতো তিন দেশ জুড়ে বিস্তৃত হতে যাওয়া এই টুর্নামেন্টটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈচিত্র্যময় উৎসব হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মাঠের বল গড়ানোর আগেই ফুটবল ছাপিয়ে আলোচনা চলে গেছে এর পেছনে থাকা বিপুল অর্থ, তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা, বিতর্কিত অভিবাসন নীতি এবং জলবায়ু সংকটের দিকে। অনেক বিশ্লেষকই মনে করছেন, মাঠের লড়াইয়ের চেয়ে মাঠের বাইরের এসব জটিলতা এই আসরকে ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত বিশ্বকাপে পরিণত করতে যাচ্ছে।

আগামী বৃহস্পতিবার মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আসতেকা স্টেডিয়ামে স্বাগতিক মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ দিয়ে পর্দা উঠছে এই ফুটবল মহাযজ্ঞের। প্রথম ভেন্যু হিসেবে তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজনের ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে এই স্টেডিয়ামটি। তবে এই রোমাঞ্চের আড়ালে মেক্সিকোজুড়ে কাজ করছে এক ধরনের উদ্বেগ। চলতি বছরে দেশটিতে মাদক চক্রের সহিংসতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষকেরা রাজধানীজুড়ে বিশ্বকাপের প্রচারণামূলক খেলোয়াড়দের মূর্তি ভেঙে ফেলেছেন এবং দাবি আদায় না হলে ম্যাচ বাধাগ্রস্ত করার হুমকি দিয়েছেন।

তবে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় নজিরবিহীন ঘটনাটি ঘটছে ভূ-রাজনৈতিক ফ্রন্টে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো স্বাগতিক দেশ এমন একটি দলের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, যার সাথে তারা সরাসরি সামরিক সংঘাতে লিপ্ত। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র সামরিক উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে ইরানি দলটিকে তাদের মূল ক্যাম্প অ্যারিজোনা থেকে মেক্সিকোর টিজুয়ানায় সরিয়ে নিতে হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই একপর্যায়ে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে নিরাপত্তা শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, এমনকি তার বিশেষ দূত ইরানকে বাদ দিয়ে ইতালিকে অন্তর্ভুক্ত করারও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ইরান অংশ নিলেও তাদের ভিসা প্রাপ্তিতে জটিলতা এবং খেলোয়াড়দের জন্য কঠোর ভ্রমণ বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সাথে স্টেডিয়ামগুলোতে প্রাক-বিপ্লব আমলের ইরানি পতাকা নিষিদ্ধ করায় লস অ্যাঞ্জেলেসের মতো ম্যাচ ভেন্যুগুলোতে রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আট বছর আগে যখন এই তিন দেশকে যৌথ স্বাগতিক হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল, তখন উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়া ও কাতার বিশ্বকাপের আর্থিক ও নৈতিক কেলেঙ্কারি কাটিয়ে ওঠা। কিন্তু এবার খোদ ফিফাই টিকিট বাণিজ্য নিয়ে বড় ধরনের সমালোচনার মুখে পড়েছে। প্রাথমিকভাবে ফাইনালের টিকিটের সর্বোচ্চ মূল্য এক হাজার সাড়ে পাঁচশ ডলার ঘোষণা করা হলেও, পরবর্তীতে ‘ডাইনামিক প্রাইসিং’ (চাহিদার ওপর ভিত্তি করে মূল্য নির্ধারণের) নীতি ব্যবহার করে তা প্রায় পৌনে নয় হাজার ডলারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একে ভক্তদের সাথে বড় ধরনের প্রতারণা হিসেবে দেখছেন সমর্থক গোষ্ঠীগুলো। এমনকি নিউইয়র্ক ও নিউজার্সির কর্মকর্তারা টিকিটের কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগে ফিফার বিরুদ্ধে তদন্তও শুরু করেছেন। অন্যদিকে বিপুল খরচের কারণে অনেক সাধারণ আমেরিকান ও বিদেশি ভক্তরা খেলা দেখা থেকে বিরত থাকছেন, যার প্রভাব পড়েছে হোটেল বুকিংয়ের হতাশাজনক চিত্রে।

নিরাপত্তা ও রাজনীতির বাইরে এবার বড় ধাক্কা এসেছে প্রকৃতির তরফ থেকে। ১৬টি ভেন্যুর মধ্যে ১৪টিতেই তাপমাত্রা বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে। এর মধ্যে স্টেডিয়ামে পানি পুনর্ব্যবহারযোগ্য বোতল বহনে ফিফার নিষেধাজ্ঞা নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলে পরবর্তীতে তারা বোতলজাত পানি বহনের অনুমতি দিতে বাধ্য হয়। পরিবেশবাদীদের মতে, ৪৮টি দলের এই বিশাল আসরে অতিরিক্ত বিমান ভ্রমণের কারণে প্রায় ৯০ লাখ টন কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন হবে, যা একে ইতিহাসের সবচেয়ে পরিবেশ-বিধ্বংসী টুর্নামেন্টে পরিণত করছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে সেনেগাল, আইভরি কোস্ট ও হাইতির মতো বেশ কয়েকটি দেশের সমর্থক ও সাংবাদিকদের ভিসা জটিলতায় পড়তে হয়েছে, এমনকি সোমালিয়ার এক রেফারিকে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতেই দেওয়া হয়নি। সবমিলিয়ে বিপুল অর্থ উপার্জন ও ফুটবলকে আমেরিকার মূলধারায় প্রতিষ্ঠার এই বিশাল মহাযজ্ঞ শেষ পর্যন্ত খেলাধুলার জয় নাকি রাজনীতির আগ্রাসন হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেয়, তা দেখার জন্য চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন।

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ