ঢাকার সাভারে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় করা মামলার এজাহার নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। মামলায় বাসটির মালিক ও একজন সাংবাদিকসহ ৪০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
গত সোমবার রাতে সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আব্বাস উদ্দিন বাদী হয়ে মামলাটি করেন। এতে বিস্ফোরক আইনে অভিযোগ আনা হয়েছে।
এজাহারে ঘটনাস্থলে ৬০ থেকে ৭০ জনের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হলেও মামলার একজন সাক্ষীর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, ঘটনার সময় তিনি সেখানে ছিলেন না। এজাহারে প্রথম সাক্ষী হিসেবে ‘আকাশ’ নামের এক ব্যক্তির একটি মোবাইল নম্বর দেওয়া হয়েছে। ওই নম্বর ব্যবহারকারীও জানিয়েছেন, ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না।
এজাহার অনুযায়ী, গত ২১ সেপ্টেম্বর রাত ২টা ৪০ মিনিটের দিকে স্থানীয়দের মাধ্যমে পুলিশ জানতে পারে, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ঢাকামুখী লেনে রেডিও কলোনি স্টাফ কোয়ার্টারের কাছে কয়েকজন ব্যক্তি পেট্রোলবোমাসহ একটি বাসে আগুন দেওয়ার জন্য জড়ো হয়েছেন।
পুলিশের দাবি, রাত ২টা ৫০ মিনিটের দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে তারা ৬০ থেকে ৭০ জনকে বাসে পেট্রোলবোমা নিক্ষেপ করে আগুন দিতে দেখে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ঘটনার দিন সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, বাসটি দীর্ঘদিন ধরে বিকল অবস্থায় সেখানে পড়ে ছিল এবং সেখানে মাদকসেবীরা আড্ডা দিতেন। ফলে ঘটনাস্থলে কারা এবং কীভাবে জড়ো হয়েছিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মামলায় বাসটির মালিক হাবিবুর রহমানকে ২ নম্বর আসামি করা হয়েছে। এজাহারে বলা হয়েছে, তিনি ইঞ্জিন ও গিয়ারবক্স খুলে বাসটি রাস্তার পাশে ফেলে রেখেছিলেন এবং পূর্বপরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাসটিতে অগ্নিসংযোগের সুযোগ তৈরি করেছিলেন।
এজাহারে হাবিবুর রহমানকে আওয়ামী লীগের সমর্থক ও ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মুরাদ জংয়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মুরাদ জং ও বিরুলিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সেলিম মণ্ডলের নির্দেশনা, সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতায় হাবিবুর রহমান অন্যদের জড়ো করে বাসটিতে আগুন দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার ১৮ নম্বর আসামি করা হয়েছে ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্র্যাব) সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং সাংবাদিক মো. কামরুজ্জামান খানকে। এজাহারে তার রাজনৈতিক পরিচয় হিসেবে আওয়ামী লীগের সাভার উপজেলা কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কামরুজ্জামান অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি সাভারে থাকেন না এবং সপরিবারে ঢাকায় বসবাস করেন। ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
কামরুজ্জামান বলেন, বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনার দিন ওসি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, বাসটি দীর্ঘদিন ধরে বিকল অবস্থায় পড়ে ছিল এবং সেখানে মাদকসেবীরা আড্ডা দিতেন। পরে একই ঘটনায় তাকে আসামি করায় তিনি বিস্মিত হয়েছেন।
মামলায় তিনজনকে সাক্ষী করা হয়েছে। প্রথম সাক্ষী হিসেবে ‘আকাশ’ নামের একজনের নাম ও একটি মোবাইল নম্বর দেওয়া হয়েছে। ওই নম্বরে যোগাযোগ করা হলে আরিফুল ইসলাম ঝলক নামে একজন ফোন ধরেন। তিনি নিজেকে স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে পরিচয় দেন।
ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন কি না জানতে চাইলে ঝলক বলেন, তিনি সেদিন সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তার ভাষ্য, নম্বরটি আকাশের নামে দেওয়া হলেও আকাশের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর নেই। আকাশ ছাত্রদলের সাভার থানা কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলেও দাবি করেন তিনি। তবে ঘটনার সময় আকাশ ঘটনাস্থলে ছিলেন কি না, তা তিনি জানেন না।
মামলার দ্বিতীয় সাক্ষী মানিকের নম্বরে একাধিকবার ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি। তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে একজন পুলিশ কনস্টেবলের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
বাস মালিককে আসামি করার কারণ জানতে চাইলে মামলার বাদী এসআই আব্বাস উদ্দিন বলেন, ঘটনার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
মামলার বিষয়ে সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল আলম বলেন, বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ৪০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও ২০ থেকে ৩০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। সাংবাদিক কামরুজ্জামানসহ কেউ ঘটনার সঙ্গে জড়িত না থাকলে তদন্ত শেষে তাদের অব্যাহতি দেওয়া হবে।
বাস মালিককে আসামি করার বিষয়ে ওসি বলেন, ইঞ্জিন খুলে বাসটি ২৬ দিন ধরে সেখানে ফেলে রাখা হয়েছিল। পুলিশ বাসটি সরিয়ে নেওয়ার জন্য কয়েকবার বললেও মালিক তা সরাননি। পুলিশের ধারণা, নাশকতার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই বাসটি সেখানে রাখা হয়ে থাকতে পারে।
এদিকে সাংবাদিক কামরুজ্জামানকে মামলায় আসামি করার ঘটনায় উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা।
এ বিষয়ে ওসি সাইফুল আলম বলেন, পুলিশ পেশাদার আচরণে বিশ্বাসী। কেউ অপরাধের সঙ্গে জড়িত না থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে তাকে চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হবে।









